মানুষের ইতিহাসে এর আগে কখনো এত দূরে যাননি কেউ— আর্টেমিস মিশনের নভোচারীরা এখন সেই অভিজ্ঞতার মধ্যেই আছেন। পৃথিবী ধীরে ধীরে তাদের পেছনে ছোট হয়ে আসছে, কিন্তু এতদিন পর্যন্ত হিউস্টন, টেক্সাসের মিশন কন্ট্রোলের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। নাসার দলের শান্ত কণ্ঠ তাদের কাছে বাড়ির সঙ্গে এক ধরনের মানসিক সংযোগ তৈরি করে রেখেছিল। তবে সেই সংযোগ খুব শিগগিরই বিচ্ছিন্ন হতে যাচ্ছে।
সোমবার (৬ এপ্রিল) দিবাগত রাত ১১টা ৪৭ মিনিটে নভোচারীরা যখন চাঁদের আড়ালে প্রবেশ করবেন, তখন মহাকাশযান ও পৃথিবীর মধ্যে যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত রেডিও ও লেজার সংকেত চাঁদের কারণে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যাবে।
প্রায় ৪০ মিনিট ধরে চার নভোচারী থাকবেন সম্পূর্ণ একা— নিজ নিজ চিন্তা ও অনুভূতির সঙ্গে, মহাশূন্যের গভীর অন্ধকারে ভেসে চলবেন তারা। এটি হবে এক গভীর নিঃসঙ্গতা ও নীরবতার মুহূর্ত।
আর্টেমিসের পাইলট ভিক্টর গ্লোভার মিশনের আগে বিবিসি নিউজকে বলেন, নির্ধারিত এই সময়টিকে বিশ্ববাসীর একত্র হওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, যখন আমরা চাঁদের আড়ালে থাকব এবং সবার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকবে, তখন এটিকে একটি সুযোগ হিসেবে নিন। আমাদের সঙ্গে আবার যোগাযোগ স্থাপনের জন্য প্রার্থনা করুন, আশা রাখুন, শুভকামনা জানান। ৫০ বছরেরও বেশি আগে, অ্যাপোলো প্রোগ্রামের নভোচারীরাও চাঁদ অভিযানের সময় এমন যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার অভিজ্ঞতা পেয়েছিলেন।
বিশেষ করে ১৯৬৯ সালের অ্যাপোলো ১১-এর চাঁদে ল্যান্ডিং মিশনের মাইকেল কলিন্স। যখন নীল আর্মস্ট্রং ও বাজ অলড্রিন চাঁদের মাটিতে প্রথম পদচিহ্ন রাখছিলেন, তখন কলিন্স একা কমান্ড মডিউলে থেকে চাঁদকে প্রদক্ষিণ করছিলেন। চাঁদের দূর প্রান্তে পৌঁছালে তার মহাকাশযান থেকে চাঁদের পৃষ্ঠে থাকা সঙ্গীদের সঙ্গে এবং মিশন কন্ট্রোলের সঙ্গেও ৪৮ মিনিটের জন্য যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
১৯৭৪ সালে প্রকাশিত তার স্মৃতিকথা 'ক্যারিং দ্য ফায়ারে' তিনি লিখেছিলেন, তিনি নিজেকে “সম্পূর্ণ একা” এবং “পরিচিত কোনো জীবনের বাইরে বিচ্ছিন্ন” মনে করেছিলেন, তবে ভীতি বা একাকীত্ব অনুভব করেননি।
পরবর্তী সাক্ষাৎকারগুলোতে তিনি বলেন, এই নীরবতা তাকে এক ধরনের শান্তি ও প্রশান্তি এনে দিয়েছিল—যা মিশন কন্ট্রোলের অবিরাম নির্দেশনা থেকে সাময়িক বিরতি হিসেবে কাজ করেছিল।
এ দিকে পৃথিবীতে, এই যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার সময়টি বেশ উদ্বেগের হবে সংশ্লিষ্টদের জন্য। ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কর্নওয়ালে অবস্থিত গুনহিলি আর্থ স্টেশনে একটি বিশাল অ্যান্টেনা আর্টেমিসের ওরিয়ন ক্যাপসুল থেকে সংকেত সংগ্রহ করছে। এটি মহাকাশযানের অবস্থান নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করে সেই তথ্য নাসার কাছে পাঠাচ্ছে।
গুনহিলির প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ম্যাট কসবাই বিবিসি নিউজকে বলেন, মানুষসহ কোনো মহাকাশযানকে আমরা এই প্রথমবার ট্র্যাক করছি।
তিনি আরও বলেন, চাঁদের আড়ালে গেলে আমরা কিছুটা নার্ভাস হয়ে পড়ব, আর আবার সংকেত ফিরে পেলে খুবই আনন্দিত হবো, কারণ তখন নিশ্চিত হবো তারা সবাই নিরাপদ আছে।
যদিও ভবিষ্যতে এই ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা হয়তো আর থাকবে না। কসবাই বলেন, চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি গড়ে তোলা এবং আরও গভীর মহাকাশ অনুসন্ধানের জন্য ২৪ ঘণ্টার পূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি বলেছেন, চাঁদে টেকসই উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হলে পূর্ণাঙ্গ যোগাযোগ দরকার—দিনের ২৪ ঘণ্টাই, এমনকি চাঁদের দূর প্রান্তেও। কারণ সেই অংশটিও অনুসন্ধান করা হবে।
সূত্র : বিবিসি নিউজ
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ লুৎফর রহমান হীরা
হেড অফিসঃ ১/ জি,আদর্শ ছায়ানীড়, রিংরোড, শ্যামলী, আদাবর ঢাকা - ১২০৭।
স্বত্ব © ২০২৫ চলনবিলের সময়