উত্তরবঙ্গের শান্ত সন্ধ্যাকে যেন হঠাৎই গ্রাস করেছিল সুর, আলো আর আবেগের এক অনন্য আয়োজন। বগুড়ার এক পাঁচতারকা হোটেলের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে বসেছিল সংগীতজগতের তারকাদের এক বিরল মিলনমেলা। উপলক্ষ ছিল ২০তম টিএমএসএস চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড। গতকাল মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) সন্ধ্যা নামতেই মঞ্চের আলো জ্বলে ওঠে, আর সেই আলোয় ধরা পড়ে দুই দশকের সংগীতযাত্রার গৌরবময় উদযাপন। ২০০৪ সালে যাত্রা শুরু করা এ আয়োজন এবার দুই দশকের পথ পেরিয়ে আরও বড় পরিসরে হাজির হয়েছে উত্তরবঙ্গে। বগুড়ার মম ইনের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে বসা এবারের আসর যেন হয়ে ওঠে সংগীতের এক উৎসবমুখর সন্ধ্যা। অনুষ্ঠানের সূচনাতেই থাকে সমবেত কণ্ঠে শিল্পীদের মনোমুগ্ধকর পরিবেশনায়। জাতীয় আবেগে ভরা দুটি গান ‘ধনধান্য পুষ্প ভরা’ ও ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’ গেয়ে তারা যেন একাত্মতার সুরে বেঁধে দেন পুরো আয়োজনকে। দর্শকরাও সেই সুরে সুর মিলিয়ে তৈরি করেন আবেগঘন এক পরিবেশ।
এবারের আয়োজনে সংগীতাঙ্গনে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয় জনপ্রিয় শিল্পী কনকচাঁপাকে। তার দীর্ঘ সংগীতজীবনের প্রতি সম্মান জানিয়ে দর্শক ও সহশিল্পীদের করতালিতে ভরে ওঠে মঞ্চ। একই সঙ্গে বিশেষ সম্মাননায় ভূষিত করা হয় লোকগানের কিংবদন্তি শিল্পী কাঙালিনি সুফিয়াকে। অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠে দুই কিংবদন্তি শিল্পী রুনা লায়লা ও সাবিনা ইয়াসমিনেই পরিবেশনা। তাদের কণ্ঠে সুর ভেসে উঠতেই যেন মুহূর্তে ফিরে আসে বাংলা গানের স্বর্ণালি দিনগুলোর স্মৃতি। দর্শকরা মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করেন তাদের গান।
পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী এ ঝলমলে আয়োজনজুড়ে মঞ্চে একের পর এক গান পরিবেশন করেন খ্যাতিমান ও সমকালীন শিল্পীরা। প্রবীণদের কণ্ঠে যেমন ছিল অভিজ্ঞতার মাধুর্য, তেমনি তরুণদের পরিবেশনায় ছিল নতুন সময়ের প্রাণচাঞ্চল্য। মঞ্চে গান শোনান খুরশীদ আলম, রফিকুল আলম, অণিমা রায়, কোনাল, ইমরান মাহমুদুল, সিঁথি সাহা, ঝিলিক, লিজা, লুইপা, মাহতিম শাকিব, এঞ্জেল নূরসহ আরও অনেকে।
শুধু গানেই সীমাবদ্ধ ছিল না আয়োজন। নাচ ও বিশেষ পরিবেশনা ছিল বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দর্শকদের উচ্ছ্বাসও যেন ততই বাড়তে থাকে। রাত ১১টার পর বগুড়ার সন্তান অপু বিশ্বাস ও আদর আজাদের অংশগ্রহণে বেহুলা-লখিন্দরের গল্পভিত্তিক এক নৃত্যনাট্য মঞ্চস্থ হয়। ঐতিহ্য আর নন্দনের সে উপস্থাপনা দর্শকদের এনে দেয় আলাদা এক আনন্দের আবেশ।
আলো, সুর আর তারকাদের উপস্থিতিতে বগুড়ার সেই রাত যেন হয়ে ওঠে সংগীতের উৎসব। দুই দশকের পথচলা পেরিয়ে টিএমএসএস চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড আবারও প্রমাণ করল— বাংলা গানের ঐতিহ্য এখনো সমান উজ্জ্বল, আর সেই আলো ছড়িয়ে পড়ছে দেশের প্রান্তে প্রান্তে।
উদ্বোধনী পর্বে বক্তব্য দেন চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবং টিএমএসএসের প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক হোসনে আরা বেগম। এ সময় সংগীতশিল্পীদের অবদানের প্রশংসা করে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান আয়োজকরা।
এবারের আসরে মোট ১৮টি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার দেওয়া হয়। আধুনিক গানে শ্রেষ্ঠ কণ্ঠশিল্পী হয়েছেন লিজা (খুব প্রিয় আমার), ইউটিউবভিত্তিক আধুনিক গানে (১ লাখ ভিউ ও ১৫০০ লাইক) স্বীকৃতি পান এঞ্জেল নূর (যদি আবার)। আধুনিক গানে শ্রেষ্ঠ সুরকার বাপ্পা মজুমদার (অবশেষে), আর গীতিকার হিসেবে সম্মাননা পান তারেক আনন্দ (প্রেমবতী) ও শাহনাজ কাজী (মা)। ব্যান্ড বিভাগে শ্রেষ্ঠ হয়েছে মেট্রিক্যাল (গণতন্ত্রের ঘুড়ি), একই গানের জন্য শ্রেষ্ঠ সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার সেতু চৌধুরী। দ্বৈত সংগীতে শ্রেষ্ঠ হয়েছেন ইমরান মাহমুদুল ও সিঁথি সাহা (প্রেম বুঝি)। লোকসংগীতে শ্রেষ্ঠ শিল্পী বিউটি (চার চাঁদে দিচ্ছে ঝলক), ইউটিউবভিত্তিক বিভাগে লটারি বিজয়ী শরিফ উদ্দিন দেওয়ান সাগর (মা লো মা)। সিনেমার গানে শ্রেষ্ঠ কণ্ঠশিল্পী আতিয়া আনিসা (ছোট্ট সোনা), ইউটিউব বিভাগে স্বীকৃতি পান দিলশাদ নাহার কনা (দুষ্টু কোকিল)। সুরকার হিসেবে পুরস্কৃত শওকত আলী ইমন, গীতিকার রোহিত সাধুখাঁ (বেঁচে যাওয়া ভালোবাসা)। মিউজিক ভিডিও নির্মাতা হিসেবে সম্মাননা পান তানভীর তারেক (পাখি আমার নীড়ের পাখি)। নজরুলসংগীতে শ্রেষ্ঠ শহিদ কবির পলাশ এবং উচ্চাঙ্গসংগীতে শ্রেষ্ঠ নাশিদ কামাল। শ্রেষ্ঠ নবাগত শিল্পী হয়েছেন সভ্যতা (অধিকার) এবং শ্রেষ্ঠ অডিও কোম্পানি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে বেঙ্গল মিউজিক।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ লুৎফর রহমান হীরা
হেড অফিসঃ ১/ জি,আদর্শ ছায়ানীড়, রিংরোড, শ্যামলী, আদাবর ঢাকা - ১২০৭।
স্বত্ব © ২০২৫ চলনবিলের সময়