
ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর হঠাৎ সাগর উত্তাল হয়ে ওঠা—পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার মৌডুবী ও আশপাশের গ্রামের জেলেদের জীবনে এই শব্দগুলো নিত্যদিনের আতঙ্ক। প্রতিদিন ভোরে নৌকা নিয়ে সাগরে নামেন তারা, কিন্তু ফিরতে পারবেন কি না—এই অনিশ্চিত ভয় সবসময় তাড়া করে বেড়ায়। সংসার, সন্তানদের পড়াশোনা আর ঘরবাড়ি টিকিয়ে রাখতে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই তাদের ভরসা শুধু নৌকা আর জালের ওপর। এই বাস্তবতায় জেলেদের ঝুঁকি কমিয়ে নিরাপদ জীবিকা গড়তে কমিউনিটি পর্যায়ে কাজ শুরু করেছে ‘ফিশনেট’ ও উত্তরণ প্রকল্প।
এরই অংশ হিসেবে রোববার (২১ ডিসেম্বর) মৌডুবী সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে মৎস্যজীবী, শেলফিশ সংগ্রহকারী, নৌযান মালিক এবং স্থানীয় নেতৃবৃন্দকে নিয়ে “কমিউনিটি পরামর্শ সভা” অনুষ্ঠিত হয়। ‘ফিশারফোক ইন্টিগ্রেশন ফর সাসটেইনেবল হ্যাবিট্যাট অ্যান্ড ন্যাচারাল ইকোসিস্টেম ট্রান্সফরমেশন (FISHNET)’ শীর্ষক এ কার্যক্রমে নেট ফিস ও উত্তরণ প্রকল্পের প্রতিনিধিদল ব্যানারে উল্লিখিত বিষয় “কমিউনিটি কনসালটেশন উইথ শেলফিশ, বোটওনার্স অ্যান্ড লোকাল লিডারস অন আর্লি অ্যাকশন প্রোটোকল (EAP)” নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
বক্তারা বলেন, উপকূলীয় জেলেদের জীবন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে দুর্যোগের সময়। তাই আর্লি অ্যাকশন প্রটোকল বা ইএপি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দুর্যোগ আসার আগেই মানুষ ও সম্পদকে সুরক্ষায় নেওয়া সম্ভব হবে। তারা ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস জানা, সতর্কসংকেতের মানে বোঝা, দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়া, নৌকা ও জাল নিরাপদে বেঁধে রাখা, শিশু-বয়স্ক ও নারীদের আগে সরিয়ে নেওয়া ইত্যাদি বিষয়ে ধাপে ধাপে করণীয় তুলে ধরেন। শুধু ত্রাণ নয়, আগাম প্রস্তুতিই এখন মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বলেও মত দেন তারা।
সভায় অংশ নিয়ে অনেক জেলে তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। কেউ বলেন, আগে শুধু আকাশের অবস্থা দেখে আন্দাজ করে সাগরে যেতেন; কখনও কখনও মাঝপথে ঝড় উঠে বড় দুর্ঘটনার মুখে পড়তে হয়েছে। এখন যদি মোবাইল বার্তা, সাইরেন, মসজিদের মাইক ও কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবীদের মাধ্যমে আগে থেকেই তথ্য পৌঁছে যায়, তাহলে নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক সহজ হবে। আরেক জেলে জানান, ‘প্রতিটি ঝড়ের পর আবার নতুন করে ঘর তুলতে হয়, জাল কিনতে হয়। শিশুদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। তাই ঝড়ের আগে যদি ঠিকমতো ব্যবস্থা থাকে, আমরা অন্তত সবকিছু হারিয়ে পথে বসবো না।’
পরামর্শ সভায় সামুদ্রিক সম্পদ ও প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র রক্ষার দিকটিও গুরুত্ব পায়। বক্তারা অবৈধ ও ক্ষতিকর জাল ব্যবহার না করা, প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকা, নদী–খাল দখল ও ভরাট বন্ধ করা এবং উপকূলীয় বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার ওপর জোর দেন। কারণ, পরিবেশ নষ্ট হলে প্রথম ধাক্কা সইতে হয় এই জেলে পরিবারগুলোকেই। সভা থেকে জেলেদের সঠিক তালিকা প্রণয়ন, সরকারি সহায়তা বণ্টনে স্বচ্ছতা এবং নারী জেলেদের কাজের স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি উঠে আসে।
উপস্থিত মৎস্যজীবীরা জানান, এমন পরামর্শ সভা তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়িয়েছে এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা তৈরি করছে। তারা আশা প্রকাশ করেন, এ ধরনের উদ্যোগ যেন একদিনের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ না থেকে নিয়মিতভাবে চলমান থাকে, যাতে উপকূলের মানুষরা ঝড়ের ভয় নিয়ে নয়, বরং প্রস্তুতি আর আত্মবিশ্বাস নিয়ে জীবিকা গড়তে পারেন।