চলনবিলের পালাগান বিলুপ্তির পথে, হারিয়ে যাচ্ছে বেহুলা-লখিন্দরের লোকস্মৃতি

: চলনবিলের সময় ডেস্ক
প্রকাশ: 3 weeks ago

66

একসময় চলনবিল ছিল কেবল জল, কাদা, মাছ আর পাখির দেশ নয়; এটি ছিল সুর, কাহিনি, প্রেম, প্রতিবাদ ও বিশ্বাসে বোনা এক জীবন্ত সাংস্কৃতিক অঙ্গন। নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পালাগান ছিল মানুষের প্রাণের উৎসব, সমাজচেতনার প্রতিধ্বনি। ভাদ্র মাস এলেই গ্রাম থেকে গ্রামে বসত পালাগানের আসর। নৌকাবাইচ, মেলা, হারমোনিয়ামের সুর আর ঢোলের তালে মুখর থাকত জনপদ।
বেহুলা-লখিন্দর, মনসামঙ্গল, মহুয়া, ভাদু কিংবা ধনপতির পালা—সবই ছিল মানুষের আনন্দ, বেদনা ও আত্মপরিচয়ের গল্প।

কিন্তু আজ সেই সুর প্রায় স্তব্ধ। প্রযুক্তির কোলাহলে হারিয়ে যাচ্ছে পালাগানের কণ্ঠস্বর। একসময়ের প্রাণবন্ত এই লোকসংস্কৃতি আজ কেবল স্মৃতি হয়ে ভাসছে চলনবিলের বাতাসে।

স্থানীয় প্রবীণরা জানান, একসময় ভাদ্র-আশ্বিন মাস এলেই প্রতিটি গ্রামে পালাগানের মঞ্চ বসত। সারারাত মানুষ ভিড় করত সেই আসরে—শুনত প্রেম-বিরহ, সামাজিক অবিচার ও নারীর সাহসিকতার গল্প। পালাগান ছিল কেবল বিনোদন নয়; এটি ছিল গ্রামীণ জীবনের জীবন্ত নাট্যমঞ্চ।

এক বেসরকারি জরিপে দেখা গেছে, ২০০৫ সালে নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে প্রায় ২৭০টি পালাগানের দল সক্রিয় ছিল। ২০১৫ সালে সেই সংখ্যা নেমে আসে ৮০-তে। আর ২০২৪ সালের হিসাবে টিকে আছে ১৫টিরও কম দল—দুই দশকে পালাগানের আসর প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে।

গুরুদাসপুর উপজেলার ৭৬ বছর বয়সী মুক্তিযোদ্ধা ও প্রবীণ পালাকার আব্দুল কাদের বলেন, “একসময় শুধু গুরুদাসপুরেই ১০-১২টি পালাদল ছিল। প্রতিটি মৌসুমেই পালাগানের ডাক পড়ত। কিন্তু এখন টেলিভিশন, ইউটিউব আর সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে নতুন প্রজন্ম এসবের দিকে ফিরেও তাকায় না। প্রবীণরা বছর ঘুরে হয়তো এক-দু’টি অনুষ্ঠান করেন স্মৃতিটা টিকিয়ে রাখার জন্য, কিন্তু আগ্রহ আর সেই পুরোনো উচ্ছ্বাসটা নেই।”

পাবনার আটঘরিয়ার শিল্পী রওশন আলীও একই সুরে বলেন, “পালাগান একসময় ছিল জীবনের আনন্দ, এখন সেটা ইতিহাস। পৃষ্ঠপোষকতা নেই, আয়োজকও মেলে না। তাই এখন দিনমজুরি করে জীবিকা চালাই। দুঃখ লাগে, এই প্রজন্মের কানে আর পালার সুর পৌঁছায় না।”

চলনবিলের বাতাসে আজও যেন ভেসে বেড়ায় বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনি। ভাদ্র মাসের রাতে পালাগানের সুরে জেগে উঠত প্রেম, ত্যাগ ও মানবতার গান। একসময় এই বিলপাড়, হাট কিংবা গ্রামের উঠোনে পালাকাররা গেয়ে যেতেন দেবীর অভিশাপ ভাঙার গল্প, যেখানে মিলেমিশে থাকত মানুষের হাসি-কান্না, বেঁচে থাকার জয়গান।

আজ সেই পালাগান নেই, তবু চলনবিলের হাওয়ায় এখনো বেহুলার নিঃশ্বাসের প্রতিধ্বনি শোনা যায়—যেন লোকসংস্কৃতির বুকেই সে এখনো বেঁচে আছে, অবিনশ্বর প্রেমের প্রতীক হয়ে।

অবক্ষয়ের কারণঃ
পালাগানের এই বিলুপ্তির পেছনে রয়েছে নানান জটিল বাস্তবতা। টেলিভিশন, ইউটিউব ও ফেসবুকের মতো ডিজিটাল বিনোদনের দাপটে পালাগান হারিয়েছে তার দর্শক। অর্থনৈতিক সংকটে অনেক পালাকার পেশা বদলে হয়েছেন কৃষি শ্রমিক, দিনমজুর বা রিকশাচালক। সরকারিভাবে কোনো পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় এ শিল্প টিকে থাকার অবলম্বন হারিয়েছে।

বর্তমান তরুণ প্রজন্ম পালাগানের সঙ্গে পরিচিত নয়—পরিবার কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেও এ ঐতিহ্যের সংযোগ গড়ে উঠছে না। অন্যদিকে নগরায়ণ, বাজার সম্প্রসারণ ও জায়গার সংকটে গ্রামীণ মঞ্চগুলো হারিয়ে গেছে। যেখানে একসময় খোলা মাঠে বসত পালার আসর, আজ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে দোকান, সড়ক ও আধুনিক স্থাপনা।

গবেষকদের অভিমত

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন বলেন,“পালাগান ছিল বাংলার গ্রামীণ সমাজের আত্মা। এর পতন আমাদের সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্বের ইঙ্গিত।”

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. ফারজানা জুঁই বলেন,“চলনবিলের মতো অঞ্চল হারিয়ে গেলে শুধু একটি ঐতিহ্য নয়, হারাবে আমাদের সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের অংশ। লোকসংস্কৃতির মাটি ভেঙে গেলে জাতির আত্মপরিচয়ও বিপন্ন হয়।”

লোকসংস্কৃতি গবেষক অধ্যাপক তাহমিনা ফেরদৌস বলেন,“পালাগানে ছিল নারীর প্রতিবাদ, প্রেম ও সাহসের প্রতিচ্ছবি। সেই সংস্কৃতির পাঠশালা আজ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।”

‘চলনবিলের ইতিকথা’ গ্রন্থের লেখক আব্দুল হামিদের তথ্যমতে, চলনবিল যাদুঘরে এখনো সংরক্ষিত আছে কিছু পালাসংস্কৃতিক উপকরণ—বেহুলা-লখিন্দরের পালায় ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্র, পোশাক, প্রাচীন পুঁথি ও মুখোশ। তবে গবেষকদের মতে, দেয়ালে টাঙানো নিদর্শন দিয়ে সংস্কৃতি টিকে থাকে না; টিকিয়ে রাখতে হলে তাকে ফিরিয়ে আনতে হয় মানুষের জীবনে, উৎসবের উল্লাসে।

সংরক্ষণের করণীয়

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, লোকসংস্কৃতি রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী—সরকারিভাবে লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণ আইন প্রণয়ন

স্কুল-কলেজে পালাগানকে ঐচ্ছিক পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা

জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে লোকগান উৎসবের আয়োজন

পালাকারদের মাসিক সম্মানী ও বয়স্ক ভাতা চালু

ডিজিটাল আর্কাইভ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন

গণমাধ্যমে লোকসংস্কৃতির নিয়মিত প্রচার নিশ্চিত করা

চলনবিল আজ তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হারিয়ে কাঁদছে। প্রযুক্তির কোলাহলে হারিয়ে যাচ্ছে হারমোনিয়ামের সুর, বেহুলার গান ও লখিন্দরের গল্প। পালাগানের বিলুপ্তি মানে কেবল একটি শিল্পের অবসান নয়, এটি এক গভীর সাংস্কৃতিক মাটির ধসের ইঙ্গিত।

প্রশ্ন হলো—আমরা কি আবার বেহুলার চোখে নিজেদের সংস্কৃতির স্বপ্ন দেখতে পারি না?
উত্তর খুঁজতে হলে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে—গাইতে হবে, লিখতে হবে, শুনাতে হবে। কারণ, সম্পূর্ণ হারিয়ে যাওয়ার আগে আমাদের থামতে হবে, ফিরতে হবে নিজের শিকড়ে।