
বাঙালির চিরায়ত লোকজ সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান উৎসব ‘নবান্ন’। শতশত বছর ধরে কৃষিনির্ভর এই দেশের মানুষ নতুন ধান ঘরে ওঠার আনন্দে পালন করে আসছে এই আদি উৎসব। কবি জীবনানন্দ দাশ নবান্নের প্রভাতের কথা স্মরণ করে লিখেছিলেন— “ধোঁয়া ওঠা ভাত, কোথায় গিয়েছে সব?”—কবির সেই আক্ষেপ আজও যেন ভেসে আসে চলনবিল অঞ্চলের মানুষের মনেও।
অগ্রহায়ণের আগমনী বার্তায় চলনবিলের ধানক্ষেতজুড়ে ভেসে বেড়ায় নতুন ধানের মৌ মৌ গন্ধ। ধান কাটার মৌসুম এলেই এখানকার গ্রামীণ জনপদে শুরু হয় নবান্ন উৎসবের প্রস্তুতি। একসময় এই উৎসবকে কেন্দ্র করে বিলপাড়ের গ্রামগুলোতে আনন্দ-বেদনার মিলনমেলা বসত—কোথাও গান, কোথাও পিঠা-পুলির আয়োজন, আবার কোথাও হরিসভায় যাত্রাপালা, কবিগান কিংবা পুঁথিপাঠ। সেই উৎসবঘন দিনগুলো এখন আর আগের মতো নেই। অপসংস্কৃতির দাপট, সময়ের পরিবর্তন আর গ্রামীণ জীবনের বদলে যাওয়া ধারা নবান্নের জৌলুস অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে।
কার্তিকের মাঝামাঝি থেকে নবান্নের আমেজ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে চলনবিলের গ্রামগুলোতে। অভাবী ঘরবাড়ির উঠোনও নতুন ধানের আগমনে নিকানো হয়ে ওঠে। বোনা আমন—কালা বকরি, আজল দিঘা, বাঁশিরাজের মতো দেশি জাতের ধান কাটার সাথে সাথেই শুরু হয় নবান্নের আনন্দ। অঞ্চলভেদে এ উৎসব চলে পৌষ পর্যন্ত। ঘরে ওঠা ধান কাঠ-খড়ির আগুনে সিদ্ধ করে শুকানো হয়। নতুন চাল দিয়ে তৈরি হয় ভাঁপা, পাকান, চিতই কিংবা কুসলী পিঠা। মেয়ের জামাইদের নিমন্ত্রণ করে পিঠা-পুলি খাওয়ানো—সবই নবান্নের ঐতিহ্যের অংশ ছিল।
কৃষক পরিবারে ধান ওঠার আনন্দ ছড়িয়ে পড়ত বাজারে, হাটে, হরিসভার মাঠে। কোথাও ভাষানযাত্রা, কোথাও যাত্রাপালা—এইসব ছিল চলনবিলের নবান্নের স্বাভাবিক রীতিনীতি। সনাতন সম্প্রদায়ের পরিবারগুলোতে তো আরও বেশি আনুষ্ঠানিকতা দেখা যেত। কিন্তু সেই সব সোনালি আয়োজন আজ ইতিহাস হয়ে যাচ্ছে।
১৯শ শতাব্দীর লেখক রমেশচন্দ্র দত্ত তার “বাংলার কৃষক” গ্রন্থে নবান্নকে ‘আমন পার্বণ’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছিলেন—আমন কাটার পর পরিবার-পরিজন একত্র হয়ে নানা আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নবান্ন উদযাপন করত। সেই চিত্রের অনেকটাই আজ বদলে গেছে।
চলনবিল অঞ্চলে এখন এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। মহাসড়ক নির্মাণ, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, ঘরে ঘরে মোটরসাইকেল, স্মার্ট টেলিভিশন, স্যাটেলাইট সংযোগ—সবকিছু মিলিয়ে গ্রামীণ জীবনে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। অনেক বড় কৃষক নিজের জমি চাষ না করে অন্যকে লিজ দেন। ফলে তাদের উঠোন আর আগের মতো গোবরের প্রলেপে ভরে ওঠে না, নতুন ধানের গন্ধেও মাখামাখি হয় না। তবে তারা নবান্নে মেয়েকে-জামাইকে নিয়ে এসে পিঠা খাওয়ানোর রীতি এখনও বজায় রাখেন—যদিও আগের মতো আচার-অনুষ্ঠানের বাহার নেই।
আরেকটি দিক ছিল এই অঞ্চলের নবান্নে—ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের অংশগ্রহণ। ওঁড়াও, মাহাতো, বুনা, বাগদি, সাঁওতালসহ বহু সম্প্রদায় চলনবিলের গ্রামগুলোতে বসবাস করত। নবান্ন উপলক্ষে তারা আয়োজন করত রঙিন উৎসব, ঝুমুর গান, নাচ, আর তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির নানা অনুষ্ঠান। ইঁদুরের গর্ত থেকে তোলা ধান দিয়ে তৈরি পিঠা ছিল তাদের বিশেষত্ব। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সম্প্রদায়গুলো প্রায় হারিয়ে গেছে, আর হারিয়ে গেছে তাদের প্রাণোচ্ছল নবান্ন-উৎসবও।
তবুও সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়নি নবান্নের টান। নতুন ধানের পিঠা-পুলি খাওয়াতে এখনো মেয়েরা নাইওরে আসেন, ঘরে-ঘরে উৎসবের আমেজ ফিরে আসে। তবে বদলে গেছে সেই উৎসবের ধারা; গ্রামীণ আঙ্গিক হারিয়ে নবান্ন এখন আধুনিক রূপে টিকে আছে।
অতীতের সেই সোনালি নবান্ন আজও স্মৃতিতে বেঁচে আছে, কিন্তু সেই জৌলুস, সেই আবেগ—সবই যেন একটু একটু করে ফিকে হয়ে যাচ্ছে চলনবিলের গ্রামীণ জীবনে।