
পাবনার চাটমোহর উপজেলার হান্ডিয়াল ইউনিয়নের ঘাটমাঝি বা পাটনী পেশায় নিয়োজিত চৌধুরি পরিবারগুলোর অনেকেই আজ পৈতৃক পেশা হারিয়ে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। নদীতে খেয়া নৌকা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা এসব পরিবারের সদস্যরা বর্তমানে ভূমিহীন, কর্মহীন ও অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। তাদের পুনর্বাসনে এখনো কার্যকর কোনো সরকারি উদ্যোগ চোখে পড়েনি বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
গত ২৬ জুন হান্ডিয়াল ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন ভাঙাচোরা ও পরিত্যক্ত সাবেক বিএস কোয়ার্টারে আশ্রয় নেওয়া কয়েকটি চৌধুরি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা হলে তারা চলনবিলের সময় কে এসব তথ্য জানায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় এলাকার বিভিন্ন নদীতে খেয়া নৌকা চালিয়ে মানুষ পারাপার করাই ছিল তাদের পূর্বপুরুষদের প্রধান পেশা। সেই আয়ের ওপরই নির্ভর করত পুরো সংসার। কিন্তু বিভিন্ন স্থানে সেতু নির্মাণ, নদীপথে খেয়াঘাট বিলুপ্ত হওয়া এবং ঘাট ইজারা ব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় তাদের ঐতিহ্যবাহী পেশা। ফলে তারা আজ জীবিকার নিশ্চয়তা হারিয়ে ভাসমান জীবনে বাধ্য হয়েছেন।
বর্তমানে এসব পরিবারের অনেকেই নদীর তীর, পরিত্যক্ত সরকারি জায়গা কিংবা জরাজীর্ণ ভবনে বসবাস করছেন। তাদের নিজস্ব কোনো জমি, ঘরবাড়ি বা সঞ্চয় নেই। জীবিকার তাগিদে কেউ হাট-বাজারে ঝাড়ুদারের কাজ করছেন, কেউ গৃহকর্মীর কাজ করছেন। আবার কেউ ঋণ নিয়ে ভ্যান কিনে চালাচ্ছেন, কেউ দিনমজুর হিসেবে অন্যের বাড়িতে শ্রম বিক্রি করছেন। কর্মক্ষমতা হারানো ব্যক্তিরা অন্যের সহায়তা কিংবা ভিক্ষার ওপর নির্ভর করে জীবন চালাচ্ছেন।
হান্ডিয়ালে পরিত্যক্ত সাবেক বিএস কোয়ার্টারের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে বসবাস করছেন লাল চাঁদ চৌধুরীর পরিবার। লাল চাঁদ কাজে থাকায় তার স্ত্রী রূপালি রাণী চৌধুরীর সঙ্গে কথা হয়।
তিনি জানান, আগে তারা কাটাগাঙের পাড়ে থাকতেন। তার স্বামী খেয়া নৌকার মাঝি ছিলেন। সেই আয়েই সংসার চলত। এখন ঘাট নেই, অনেক স্থানে সেতু হয়েছে, আবার কোথাও ঘাটের দায়িত্ব চলে গেছে প্রভাবশালীদের হাতে। ফলে তাদের আর আগের মতো কাজ নেই। নদীর পাড়েও থাকতে দেওয়া হয় না। বাধ্য হয়ে তারা পরিত্যক্ত ভবনে আশ্রয় নিয়েছেন।
রূপালি রাণী বলেন, অনেক কষ্ট করে ধারদেনা ও মানুষের সহযোগিতায় এক মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। অর্থাভাবে ছেলে বাধনের লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সংসারের খরচ চালাতে সে মাঝেমধ্যে বিভিন্ন দোকানে কাজ করে।
একই ভবনে বসবাসকারী আলতা রাণী চৌধুরীও নিজের দুর্দশার কথা তুলে ধরেন। তার স্বামী কিশোরী লাল চৌধুরী দিনমজুরের কাজ করে যা আয় করেন, তা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চলে। তাদের কোনো ছেলে নেই, তিন মেয়ে। অনেকের সহযোগিতায় এক মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। বাকি দুই মেয়ের বিয়ে নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে। নিজের কোনো জমি বা ঘরবাড়ি না থাকায় ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
ভুক্তভোগীরা জানান, তারা এখনো কোনো সরকারি ভাতা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্ড কিংবা আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর পাননি। মাথা গোঁজার স্থায়ী আশ্রয় না থাকায় তারা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন।
স্থানীয়দের মতে, উন্নয়নের ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হলেও খেয়া নৌকানির্ভর বহু পরিবারের জীবন-জীবিকা হারিয়ে গেছে। উন্নয়নের সুফলের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত এসব পরিবারকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন ছিল, যা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।
পেশা হারানো চৌধুরি পরিবারগুলোর দাবি, তারা আর খেয়াঘাট ফিরে পাওয়ার আশা করছেন না। তবে বেঁচে থাকার জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান, সরকারি সহায়তা এবং স্থায়ী বাসস্থানের ব্যবস্থা চান। সমাজের অন্যান্য মানুষের মতো সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।