চিনির বিকল্প হিসেবে মধু খাওয়া কি ভালো? যা বলছে বিজ্ঞান

: চলনবিলের সময় ডেস্ক
প্রকাশ: 2 days ago

16

চিনি—এই এক উপাদানকে ঘিরেই স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের যত আপত্তি। কেউ একে বলেন ‘সাদা বিষ’, কেউ আবার নানাভাবে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করেন দৈনন্দিন খাদ্যতালিকা থেকে। কিন্তু মিষ্টি স্বাদ তো আর সহজে ছাড়ার নয়। তাই চিনির বিকল্প হিসেবে বেশিরভাগ মানুষের প্রথম পছন্দ হয়ে ওঠে মধু। সকালে লেবু-মধু পানি, চায়ের কাপেও এক চামচ মধু—ভাবটা এমন যেন চিনি বাদ দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেল।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি মধু চিনির তুলনায় এতটাই স্বাস্থ্যকর? নাকি এটিও এক ধরনের মিষ্টি ফাঁদ? পুষ্টিবিজ্ঞান ও গবেষণা কী বলছে—চিনির বদলে মধু খাওয়া আদৌ কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়েই এই প্রতিবেদন।

চিনি বনাম মধু : বিজ্ঞানের আয়নায় কার পাল্লা ভারী?

মধু ও চিনি দুটিই মূলত কার্বোহাইড্রেট এবং গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজের সমন্বয়ে তৈরি। তবে উৎপাদন প্রক্রিয়া ও পুষ্টিগুণের দিক থেকে এদের মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।

১. পুষ্টি উপাদানের পার্থক্য

চিনি : চিনি পুরোপুরি প্রক্রিয়াজাত একটি উপাদান। এতে কোনো ভিটামিন বা খনিজ উপাদান নেই। একে বলা হয় ‘অ্যাম্পটি ক্যালোরি’—যেখানে শক্তি পাওয়া গেলেও শরীর কোনো পুষ্টি পায় না।

মধু : মধু একটি প্রাকৃতিক উপাদান। এতে ক্যালোরির পাশাপাশি সামান্য পরিমাণে পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, আয়রন এবং কিছু এনজাইম থাকে। তবে বাস্তবতা হলো, এই পুষ্টিগুণ থেকে উল্লেখযোগ্য উপকার পেতে হলে প্রচুর পরিমাণে মধু খেতে হবে, যা আবার অতিরিক্ত ক্যালোরির ঝুঁকি বাড়ায়।

২. গ্লাইসেমিক ইনডেক্স

চিনির তুলনায় মধুর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স সামান্য কম। অর্থাৎ চিনি খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা যেভাবে দ্রুত বাড়ে, মধুর ক্ষেত্রে সেই বৃদ্ধি কিছুটা ধীর গতির। এই কারণে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য মধু চিনির চেয়ে সামান্য ভালো বিকল্প হতে পারে, তবে একে একেবারেই নিরাপদ বলা যায় না।

৩. অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের গুণ

মধুতে রয়েছে পলিফেনল ও ফ্ল্যাভোনয়েডের মতো অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যা শরীরের প্রদাহ (Inflammation) কমাতে সাহায্য করে। চিনির মধ্যে এ ধরনের কোনো অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট বা ঔষধি গুণ নেই।

মধু খাওয়ার আগে যেসব সতর্কতা জানা জরুরি

বিজ্ঞান বলছে, মধু যতটা উপকারী বলে প্রচলিত, এর কিছু নেতিবাচক দিকও মাথায় রাখা জরুরি—

অধিক ক্যালোরি : এক টেবিল চামচ চিনিতে থাকে প্রায় ৪৯ ক্যালোরি, আর সমপরিমাণ মধুতে থাকে প্রায় ৬৪ ক্যালোরি। ফলে ‘স্বাস্থ্যকর’ ভেবে বেশি মধু খেলে ওজন দ্রুত বাড়তে পারে।

দাঁতের ক্ষতি : মধুর গঠন আঠালো হওয়ায় এটি চিনির চেয়েও বেশি সময় দাঁতের সংস্পর্শে থাকে। ফলে দাঁতে ক্যাভিটি বা ক্ষয় হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

শিশুদের জন্য ঝুঁকি : এক বছরের কম বয়সী শিশুদের কখনোই মধু খাওয়ানো উচিত নয়। এতে ‘বটুলিজম’ নামক গুরুতর বিষক্রিয়া হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

চিনির বিকল্প হিসেবে মধু কি সেরা?

পুষ্টিবিদদের মতে, যারা প্রক্রিয়াজাত খাবার ও রিফাইন্ড সুগার এড়িয়ে চলতে চান, তাদের জন্য চিনির তুলনায় মধু একটি ‘বেটার অপশন’। তবে এটি কখনোই ‘সেরা বিকল্প’ নয়। কারণ মধুও শেষ পর্যন্ত এক ধরনের চিনি—যাকে বলা হয় ন্যাচারাল সুগার।

কাদের জন্য মধু তুলনামূলকভাবে ভালো?

১. যারা সাধারণ সর্দি-কাশির সমস্যায় ভুগছেন

২. যারা শরীর ডিটক্স করতে চান (যেমন লেবু-মধু পানি)

৩. যারা কৃত্রিম চিনির বদলে প্রাকৃতিক স্বাদ পছন্দ করেন

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সতর্কতা : মধু চিনির তুলনায় রক্তে শর্করা বাড়াতে কিছুটা সময় নিলেও শেষ পর্যন্ত এটি সুগার লেভেল বাড়ায়। তাই ডায়াবেটিস থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া মধুকে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে ধরা ঠিক নয়।

সবশেষে বলা যায়, চিনি বাদ দিয়ে মধু ধরলেই যে স্বাস্থ্য ঝুঁকি শূন্যে নেমে আসে—এমন ধারণা সঠিক নয়। পরিমিতি আর সচেতন ব্যবহারই এখানে মূল চাবিকাঠি।

সূত্র হিন্দুস্তান টাইমস