‘ঝাই’ বিক্রি করে ঘুরে দাঁড়ানো দুই শতাধিক পরিবার

: শেরপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: 3 weeks ago

74

একসময় পেকুয়া বিলের মাছই ছিল শত শত মানুষের জীবিকার একমাত্র ভরসা। কিন্তু সময়ের সাথে সেই বিলই হয়ে ওঠে মাছ ধরার অযোগ্য। কারণ, বিলে ছড়িয়ে পড়ে ‘ঝাই’—ভাসমান জলজ উদ্ভিদ, যা মাছের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে এবং প্রজনন ব্যাহত করে। তবে এখন এই ‘ঝাই’-ই আশীর্বাদ হয়ে এসেছে স্থানীয়দের জীবনে। শেরপুরের নকলা উপজেলার গণপদ্দি এলাকার পেকুয়া বিলের এই ঝাই সংগ্রহ করেই জীবিকা নির্বাহ করছেন প্রায় দুই শতাধিক পরিবার।

২১৯ একর আয়তনের পেকুয়া বিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্য স্থানীয়দের কাছে সুপরিচিত। একসময় বিলের বেশিরভাগ জায়গা জুড়ে থাকা ঝাই ছিল জেলেদের জন্য অভিশাপ; এখন সেটিই জীবিকার প্রধান উৎস।

স্থানীয় মৎস্যচাষিরা জানান, ঝাই হলো ভাসমান সবুজ জলজ উদ্ভিদ, যা বিল বা খালের পানির ওপর চাদরের মতো ভেসে থাকে। অনেক এলাকায় একে ‘তরুলতা’ বা ‘জলঢাকনা’ নামেও ডাকা হয়। রুই, কাতলা, মৃগেল, শিং, মাগুর ও তেলাপিয়া মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য এই ঝাই। প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায় বলে এটি এখন মাছচাষিদের কাছে অত্যন্ত সাশ্রয়ী ও জনপ্রিয় খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

বিলপাড়ের সানি ইসলাম জানান, তিনি প্রায় এক দশক ধরে ঝাই সংগ্রহ করছেন। ফজরের নামাজ শেষে প্রতিদিন ছোট ডিঙি নিয়ে তিনি বিলে যান। “সকালে ঝাই নরম থাকে, তুলতে সুবিধা হয়,” বলেন সানি। “বাঁশ দিয়ে ঝাই তুলে নৌকায় ভরি, তারপর বিলের ধারে এনে স্তুপ করে রাখি। পরে মাছচাষিদের কাছে বিক্রি করি।”

একই এলাকার আব্দুর রহিম জানান, “দুজন মিলে এক বেলায় প্রায় পাঁচ ভ্যান ঝাই তোলা যায়। প্রতি নৌকা ঝাই বিক্রি হয় ৮০০ থেকে ১০০০ টাকায়। দিনে দুই বেলা কাজ করলে দুই হাজার টাকার মতো আয় হয়। এতে সংসার এখন ভালোই চলছে।”

ঝাইয়ের ক্রেতা মাছচাষি মনির হোসেন বলেন, “দুই ভ্যান ঝাই দিলে ছয়টি পুকুরের মাছ দুই সপ্তাহ খেতে পারে। ফলে প্রক্রিয়াজাত ফিডের (খাদ্য) ওপর নির্ভরতা অনেক কমে গেছে।”

আরেক মাছচাষি শফি উদ্দিন বলেন, “আগে প্রতি মাসে প্রায় ১০ হাজার টাকার ফিড কিনতে হতো। এখন দুই ভ্যান ঝাই দিলেই সেই চাহিদা পূরণ হয়। এতে খরচও অর্ধেকের বেশি কমে গেছে।”

কৈয়ার বাজারের বাসিন্দা বরুণ চৌধুরী বলেন, “এক সময় ঝাই এত বেশি ছড়িয়ে পড়েছিল যে মাছ ধরা প্রায় অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এখন সেই ঝাই-ই অনেক পরিবারের জীবিকার নতুন পথ খুলে দিয়েছে।”

নকলা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা অনিক রহমান বলেন, “ঝাই সংগ্রহের মাধ্যমে যেমন মাছচাষিদের খাদ্য ব্যয় কমছে, তেমনি বিলের অতিরিক্ত জলজ উদ্ভিদ অপসারণের ফলে জলজ পরিবেশের ভারসাম্যও ফিরছে।”

প্রকৃতির একসময়কার ‘অভিশাপ’ এখন আশীর্বাদে পরিণত হয়েছে—পেকুয়া বিলের এই পরিবর্তন যেন জীবিকার নতুন সম্ভাবনার এক অনন্য উদাহরণ।