
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার ঐতিহাসিক জমিদার রায় লাল বাহাদুর–এর স্মৃতিবিজড়িত ইতিহাসের অন্যতম সাক্ষী হয়ে আজও সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন শ্রীশ্রী রাধাগোবিন্দ মন্দির। প্রায় ৩২০ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই মন্দিরে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও শুরু হয়েছে ২৪ প্রহরব্যাপী মহানাম যজ্ঞ। এটি কেবল একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়; বরং উত্তরবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ আধ্যাত্মিক ও সামাজিক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
ইতিহাসের পাতায় মন্দির ও উৎসব
বাংলা ১১০৫ বঙ্গাব্দে (ইংরেজি ১৬৯৮–৯৯ সালে) প্রতিষ্ঠিত এই মন্দিরটি বর্তমানে তাড়াশ উপজেলার সনাতন সংস্থার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। মন্দির কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন শ্রী তপন চন্দ্র গোস্বামী, সাধারণ সম্পাদক শ্রী মৃদুল সরকার পলু এবং সহ-সভাপতি শ্রী সনাতন দাস।
উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রাচীন জমিদারি হিসেবে পরিচিত রায় লাল বাহাদুরের এস্টেটের অংশ এই মন্দির। শতাব্দীপ্রাচীন স্থাপনাটি আজও তার ঐতিহ্য ও স্থাপত্যগৌরবে অটুট রয়েছে। মন্দির প্রাঙ্গণ বর্তমানে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত।
অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ
২৪ প্রহরব্যাপী কীর্তন:
টানা তিন দিন ও তিন রাত (৮ প্রহর × ৩ দিন) বিরতিহীনভাবে চলছে মহানাম সংকীর্তন। পাশাপাশি গৌর-গোবিন্দের ‘অষ্টকালীন লীলা কীর্তন’ পরিবেশন করছেন দেশবরেণ্য খ্যাতনামা কীর্তনীয়া দলসমূহ।
ঐতিহাসিক স্থাপত্যশৈলী:
ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য মন্দিরের প্রাচীন টেরাকোটা অলংকরণ ও অনন্য নির্মাণশৈলী বিশেষ আকর্ষণ। দেয়ালের কারুকাজ ও নকশায় ফুটে উঠেছে জমিদার আমলের আভিজাত্য ও শিল্পরুচির নিদর্শন।
সামাজিক সম্প্রীতির মিলনমেলা:
জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে হাজারো মানুষ এই উৎসবে অংশ নিচ্ছেন। ভক্তদের মাঝে প্রসাদ বিতরণ ও নামকীর্তন শ্রবণের মাধ্যমে গড়ে উঠছে ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির অনন্য পরিবেশ।
গ্রামীণ মেলা ও উৎসবের আবহ
যজ্ঞকে কেন্দ্র করে মন্দির সংলগ্ন এলাকায় বসেছে বিশাল গ্রামীণ মেলা। মেলায় স্থানীয় হস্তশিল্প, ধর্মীয় বই-পুস্তক, শাঁখা-সিঁদুরের দোকানসহ বিভিন্ন মুখরোচক খাবারের সমাহার রয়েছে। খোল-করতালের ধ্বনি ও যজ্ঞের ধোঁয়ায় পুরো এলাকা এখন উৎসবমুখর ও স্বর্গীয় আবহে ভরপুর।
স্থানীয়দের মতে, জমিদার রায় লাল বাহাদুর প্রবর্তিত এই ধর্মীয় আয়োজন আজও তাড়াশবাসীর হৃদয়ে অমলিন। সিরাজগঞ্জ জেলার অন্যতম প্রাচীন ও গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য হিসেবে শ্রীশ্রী রাধাগোবিন্দ মন্দিরের মহানাম যজ্ঞ বিশেষ মর্যাদা বহন করে আসছে।