চারদিকে নদী-সাগরের বিশাল জলরাশিতে ঘেরা পটুয়াখালীর রাংগাবালী উপজেলার প্রায় ১ লক্ষ ১৮ হাজার মানুষ চিকিৎসা সেবার জন্য নদীপথে প্রাণঝুঁকি নিয়ে পার্শ্ববর্তী উপজেলাগুলোতে যাতায়াত করছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শুরু হওয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় এই বিচ্ছিন্ন জনপদের মানুষ চরম ভোগান্তিতে জর্জরিত। নবনিযুক্ত সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোরালো আহ্বান—অবিলম্বে কাজ পুনরায় শুরু করে দ্রুত সময়ের মধ্যে হাসপাতাল চালু করুন!ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা ও চিকিৎসা-যাত্রার প্রাণঘাতী ঝুঁকি রাংগাবালী উপজেলা পটুয়াখালী জেলার দক্ষিণ-পূর্বাংশে ২৫০ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় অবস্থিত। উত্তরে আগুনমুখা নদী, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে তেতুলিয়া নদী এবং পশ্চিমে রাবনাবাদ নদী—স্থলপথে অন্য কোনো উপজেলার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। জেলা সদর হাসপাতালে পৌঁছাতে নৌকায় ২-৩ ঘণ্টা সময় লাগে। স্থানীয়রা চিকিৎসার জন্য নৌকায় গালিয়াকান্ডা, কলাপাড়া বা দশমিনা উপজেলায় যান। কিন্তু ঝড়ো বাতাস, জোয়ার-ভাটা এবং নৌকা ডুবির ভয়ে প্রতিটি যাত্রাই মৃত্যুর খেলা। গত এক বছরে নদীপথে চিকিৎসা-যাত্রায় কমপক্ষে ৮-১০ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
মানুষের ভোগান্তির চিত্র: বাস্তব ঘটনার আলোকে স্থানীয় গর্ভবতী মা রহিমা বেগম (৩২) গত বছর নৌকায় জেলা হাসপাতালে যাত্রা করতে গিয়ে ঝড়ে পড়ে শিশুসহ প্রাণ হারান। এমন ঘটনা একাধিক বার ঘটছে। ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত শিশুরা স্থানীয় প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্রে শুধু প্যারাসিটামল পেয়ে লড়াই করছেন। গত বছর এই রোগে ১৫০-এর বেশি শিশু মারা গেছে। হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক রোগী বৃদ্ধরা নৌকায় ৩-৪ ঘণ্টা যাত্রায় পথেই মৃত্যুবরণ করছেন—মাসে ২০-২৫টি এমন ঘটনা ঘটছে। স্থানীয় আব্দুল করিম বলেন, "এই হাসপাতাল না থাকলে আমরা সাগরের মাঝি হয়ে থাকব, চিকিৎসা নয়!"স্থানীয় প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্রে শুধু ২-৩ জন স্বাস্থ্যকর্মী, কোনো আইসিইউ, অক্সিজেন বা অ্যাম্বুলেন্স নেই। জটিল রোগে রোগীদের নৌকায় করে পাঠানো হয়, যেখানে ৭০% ক্ষেত্রে অবস্থা আরও খারাপ হয়।অসমাপ্ত হাসপাতাল: নির্মাণের ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের উদ্যোগে ২০ কোটি টাকা বাজেটে ৫০ শয্যা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নির্মাণ শুরু হয়। প্রথম দু’বছরে ভিত্তি, প্রথম তলা ও আংশিক দেয়াল তৈরি হয় (৪০% অগ্রগতি)। কিন্তু ২০২০ সাল থেকে তহবিল অভাব ও ঠিকাদার প্রত্যাহারে কাজ বন্ধ। ২০২৪ সালের মার্চে ছাদ ভেঙে পড়ে, বর্তমানে অর্ধ-নির্মিত ভবন বৃষ্টি-কুমীরে ধসে পড়ছে। সরকারি সূত্র জানায়, প্রকল্পটি ‘অধরায়’ আছে।
হাসপাতাল চালুর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হাসপাতাল দ্রুত সম্পন্ন করতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ অবিলম্বে নিতে হবে:তহবিল বরাদ্দ: অবশিষ্ট ১২ কোটি টাকা তাৎক্ষণিক মঞ্জুর করুন নতুন ঠিকাদার নিয়োগ: বিশ্বস্ত ঠিকাদার দিয়ে ৩ মাসের মধ্যে কাজ শেষ করুন চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ: ১০ জন চিকিৎসক, ৩০ জন নার্স ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করুন অ্যাম্বুলেন্স-বোট: জরুরি চিকিৎসার জন্য নৌ-অ্যাম্বুলেন্স চালু করুন বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ: অবিলম্বে ইউপিএস, জেনারেটর ও পানি শোধনাগার স্থাপন করুন নবনিযুক্ত সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান নবনিযুক্ত সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের প্রতি সরাসরি আহ্বান—রাংগাবালীর ১ লক্ষ ১৮ হাজার মানুষের প্রাণরক্ষার জন্য এই হাসপাতালকে অগ্রাধিকার দিন। ৩ মাসের মধ্যে কাজ সম্পন্ন না করলে এই জনপদের কান্না থামবে না। নতুন সরকারের প্রথম পরীক্ষা—বিচ্ছিন্ন মানুষের জন্য জীবনরক্ষার আলো জ্বালান!স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, "আমাদের হাসপাতাল চাই, নৌকায় মৃত্যুর খেলা নয়!" কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপের অপেক্ষায় রাংগাবালী।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ লুৎফর রহমান হীরা
হেড অফিসঃ ১/ জি,আদর্শ ছায়ানীড়, রিংরোড, শ্যামলী, আদাবর ঢাকা - ১২০৭।
স্বত্ব © ২০২৫ চলনবিলের সময়