পাবনা-৩ আসন যা ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর ও ফরিদপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে আলোচিত আসনগুলোর একটি। এখানে বিএনপির কেন্দ্রীয় কৃষকদলের সভাপতি হাসান জাফির তুহিন মনোনীত প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন চাটমোহর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি কে এম আনোয়ারুল ইসলাম। এভাবে দুই শক্তিশালী প্রার্থী এক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় ভোট বিভাজনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
শেষ পর্যন্ত দাঁড়িপাল্লার প্রতীকের জামায়াত প্রার্থী আলী আছগার ১ লাখ ৪৭ হাজার ৪৭৫ ভোট পান।তিনি মাত্র ৩,২৬৯ ভোট ব্যবধানে জয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হাসান জাফির তুহিন পান ১,৪৪,২০৬ ভোট, আর স্বতন্ত্র প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলাম পান ৩৮,০২৭ ভোট। ভোট হার ছিল শতকরা ৭০.২২%, বাতিল ভোটের সংখ্যা ৬,৬৮৩। এই সংকীর্ণ ব্যবধান প্রমাণ করে যে, প্রতিটি ভোট কতটা গুরুত্বপূর্ণ, এবং দলীয় ঐক্য না থাকলে শক্তিশালী ব্যক্তিত্বও জয়ী হতে পারে না।
নির্বাচনের ফলাফল থেকে একটি স্পষ্ট শিক্ষা হলো—স্থানীয় প্রার্থীর জনপ্রিয়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুরে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী সবচেয়ে বেশি ভোট পান, যা তাকে জয়ী করেছে। চাটমোহরে ধানের শীষের প্রার্থী এগিয়ে ছিলেন, তবে স্থানীয় উপস্থিতি ও জনপ্রিয়তার কারণে সমগ্র আসনে জয় নিশ্চিত হয়। এটি আবারও প্রমাণ করে যে, শুধু কেন্দ্রীয় সমর্থন বা পরিচিতি নয়, স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সখ্যতা এবং নিয়মিত অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে নির্বাচন প্রক্রিয়া ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ফলাফলের পরে অভিযোগ করেছেন ভোট গণনায় অনিয়ম হয়েছে এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ। এই অভিযোগ নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি জনসাধারণের আস্থা নিয়ে চিন্তার বিষয়।
এবারের নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দলীয় অভ্যন্তরীণ বিভাজন। বিএনপির দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর মধ্যে বিভাজন ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর উপস্থিতি দলকে ব্যর্থ করেছে। দলীয় সমন্বয় না থাকলে শক্তিশালী প্রার্থীর জয়ও নিশ্চিত নয়—এটি ভাঙ্গুড়া অঞ্চলের ভোটাররা স্পষ্টভাবে দেখেছেন।
পাবনা-৩ আসনের এই ফলাফল আমাদের জন্য একটি বড় শিক্ষা বহন করছে—দলীয় ঐক্য, স্থানীয় জনপ্রিয়তা এবং ভোটারদের আস্থা একটি নির্বাচনের সফলতার মূল চাবিকাঠি। ভবিষ্যতে দলগুলো যদি অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়, তবে ভোটের ভাগাভাগি পুনরায় রাজনৈতিক বাস্তবতাকে বদলে দিতে পারে।
শেষপর্যন্ত, পাবনা-৩ আসনের এই ফলাফল কেবল একটি ভোটের জয় নয়; এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা, রাজনৈতিক দলগুলোর দায়বদ্ধতা এবং স্থানীয় নেতৃত্বের গুরুত্বের একটি বাস্তব চিত্র। প্রতিটি রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীকে এ থেকে শিক্ষা নিতে হবে—যে কোনও নির্বাচনে জয়ী হওয়া মানেই শুধু ব্যক্তিগত বা দলীয় শক্তি নয়, জনগণের সঙ্গে সখ্যতা ও দায়িত্ব পালনও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ লুৎফর রহমান হীরা
হেড অফিসঃ ১/ জি,আদর্শ ছায়ানীড়, রিংরোড, শ্যামলী, আদাবর ঢাকা - ১২০৭।
স্বত্ব © ২০২৫ চলনবিলের সময়