পাল্টে গেল আসন বিন্যাস, নতুন সমীকরণে বিএনপি-জামায়াত মুখোমুখি

: চলনবিলের সময়
প্রকাশ: 5 days ago

90

পাবনার গুরুত্বপূর্ণ তিনটি আসন— পাবনা-১, পাবনা-২ ও পাবনা-৩—এ আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পরিবর্তিত আসন বিন্যাস, স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণ, বিরোধী জোটের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সম্ভাবনায় পুরো নির্বাচনী মাঠে নতুন উত্তাপ সৃষ্টি হয়েছে। গত তিন দশকের রাজনৈতিক ইতিহাস এবার নতুনভাবে বিবেচনায় আসছে।

পাবনা-১ : ২৯ বছর পর আসন পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে জামায়াত, অপেক্ষায় বিএনপি

আগে সাঁথিয়া ও বেড়া উপজেলার অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত পাবনা-১ আসনটি এবার কেবল সাঁথিয়া উপজেলা নিয়ে পুনর্গঠিত হয়েছে।
১৯৯১ ও ২০০১ সালে এ আসনটি ছিল জামায়াতে ইসলামীর দখলে। মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দলটির সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামী দুটি মেয়াদে এমপি ছিলেন। এরপর আর দলটি আসনটি ধরে রাখতে পারেনি।

১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টি ও ১৯৯৬ সালের সংক্ষিপ্ত মেয়াদে বিএনপি এখানে এমপি পেয়েছিল। পরে ১৯৯৬-২০০১ এবং ২০০৮-২০২৪ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ আসনটি ধরে রাখে। ফলে বিএনপি এখানে তেমন শক্ত অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।

এবারও বিএনপি এখনো প্রার্থী ঘোষণা করেনি। বিপরীতে জামায়াত মনোনয়ন দিয়েছে নিজামীর পুত্র ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেনকে। জামায়াতের দীর্ঘদিনের ভোটব্যাংক থাকায় দাঁড়িপাল্লা বনাম ধানের শীষের লড়াইয়ে জামায়াতই কিছুটা এগিয়ে থাকবে বলে স্থানীয়দের ধারণা—যদি বিএনপি শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থী না দিতে পারে।

অন্যান্য প্রার্থী :

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ: মাওলানা আব্দুল গণি

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস: মাওলানা আমজাদ হোসেন

এনসিপি: প্রার্থী ঘোষণা হয়নি
এই আসনে ভোটার সংখ্যা ৩,১৬,৫৫৩ জন।

পাবনা-২ : শক্ত অবস্থানে বিএনপি, পিছিয়ে নেই জামায়াত

সুজানগর ও বেড়া উপজেলা নিয়ে গঠিত পাবনা-২ আসনে ১৯৯১ ও ২০০১ সালে বিজয়ী হয়েছিল বিএনপি। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ জিতেছে ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে—অর্থাৎ টানা প্রায় তিন দশক ধরেই বিএনপি এই আসনটি ধরে রাখতে পারেনি।

এবার বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দুইবারের সাবেক এমপি কে এম সেলিম রেজা হাবিবের নামই দলীয় সূত্রে সবচেয়ে আলোচনায় আছে। জামায়াতের প্রার্থী সুজানগর উপজেলা আমির অধ্যাপক মাওলানা হেসাব উদ্দিন। দুই দলই এখানে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।

স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থীর তেমন নাম শোনা যাচ্ছে না, যা বিএনপির জন্যই সুবিধাজনক বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

অন্যান্য প্রার্থী :

এনসিপি: মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ

ইসলামী আন্দোলন: মাওলানা আফজাল হোসেন

খেলাফত মজলিস: মাওলানা আলতাব হোসেন

গণঅধিকার পরিষদ: গোলাম সরওয়ার খান জুয়েল
মোট ভোটার ৪,৬১,৯০৭ জন।

পাবনা-৩ : স্থানীয় প্রার্থী না পাওয়ায় বিএনপির সংকট, স্বতন্ত্রের সম্ভাবনা জোরালো

চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর নিয়ে গঠিত পাবনা-৩ আসনটিতে ২০০৮ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত টানা আওয়ামী লীগের মকবুল হোসেন এমপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

এর আগে ১৯৯১ সালে বিএনপির সাইফুল আযম ও ২০০১ সালে বিএনপির কে এম আনোয়ারুল ইসলাম নির্বাচিত হয়েছিলেন। প্রায় দুই যুগ ধরেই বিএনপি এই আসনে পিছিয়ে।

এবার বিএনপি মনোনীত সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে কেন্দ্রীয় কৃষক দলের সভাপতি কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিনের নাম ঘোষণা করেছে। তবে তিনি এই আসনের স্থানীয় নন, তার বাড়ি সুজানগরে—যা রাজনৈতিকভাবে ব্যাপক আলোচনা ও বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।

স্থানীয়ভাবে মনোনয়ন প্রত্যাশী :

কে এম আনোয়ারুল ইসলাম (সাবেক এমপি)

হাসাদুল ইসলাম হীরা (সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌরমেয়র)

হাসানুল ইসলাম রাজা

ব্রিগেডিয়ার (অব.) একে এম সাইফুল ইসলাম (সেলিম)

স্থানীয় নেতারা স্পষ্ট জানিয়েছেন—প্রার্থী পরিবর্তন না হলে কেউ কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হবেন। যদি এমনটি ঘটে, তবে এখানে লড়াই হবে মূলত জামায়াত বনাম স্বতন্ত্র প্রার্থী, যেখানে মাঠ জরিপ বলছে স্বতন্ত্র প্রার্থীই এগিয়ে থাকতে পারেন।

চাটমোহর উপজেলার ভোটার সংখ্যা তিন উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি হওয়ায় এখানকার ভোটই মূল নির্ধারক হতে পারে।

অন্যান্য প্রার্থী :

জামায়াত: অধ্যাপক মাওলানা মো. আলী আসগার (ভাঙ্গুড়া)

এনসিপি: খন্দকার আক্তার হোসেন লেবু

গণফোরাম: সরদার আশা পারভেজ

খেলাফত মজলিস: মুফতি মো. মফিজ উদ্দিন

ইসলামী আন্দোলন: মাওলানা আলহাজ মো. আবদুল খালেক
এই আসনে ভোটার ৪,৫৬,০৯৪ জন।

পরিবর্তিত আসন বিন্যাসে তিন আসনেই তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক লড়াইয়ের দৃশ্যপট। কোথাও জামায়াতের ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা, কোথাও বিএনপির পুরোনো আসন পুনরুদ্ধারের চেষ্টা, আবার কোথাও স্বতন্ত্র প্রার্থীর আবির্ভাবে পাল্টে যেতে পারে পুরো সমীকরণ।