বিশ্বকাপের মঞ্চে আর্জেন্টিনা শুধু শিরোপার দৌড়েই নয়, আরও একটি বিশেষ পরিসংখ্যানেও সবার ওপরে। গত দুই ফিফা বিশ্বকাপ মিলিয়ে সবচেয়ে বেশি পেনাল্টি পাওয়া দল তারা। সফাস্কোরের টুর্নামেন্ট পর্যালোচনার তথ্য অনুযায়ী, কাতার ২০২২ ও ২০২৬ বিশ্বকাপ মিলিয়ে আর্জেন্টিনা এখন পর্যন্ত আটটি পেনাল্টি পেয়ে শীর্ষে অবস্থান করছে। তালিকার দ্বিতীয় স্থানে থাকা ইংল্যান্ডের পেনাল্টি সংখ্যা চার—অর্থাৎ আর্জেন্টিনার ঠিক অর্ধেক।
এই তালিকায় ব্রাজিল, পর্তুগাল ও ফ্রান্সের নামের পাশে রয়েছে তিনটি করে পেনাল্টি। পোল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, ইরান ও জার্মানি পেয়েছে দুটি করে। আরও ১৩টি দল পেয়েছে একটি করে পেনাল্টি। কিন্তু সংখ্যার বিচারে আর্জেন্টিনা একেবারেই আলাদা উচ্চতায়। এটি কোনো একক টুর্নামেন্টের বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দুই বিশ্বকাপ, ভিন্ন ভিন্ন প্রতিপক্ষ এবং ভিন্ন পরিস্থিতিতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে আর্জেন্টিনার আক্রমণাত্মক ধরন—বক্সে বারবার প্রবেশ, ড্রিবল, ওভারল্যাপ এবং কাটব্যাক নির্ভর ফুটবল। লাইভ ম্যাচে সফাস্কোরের ইভেন্ট ট্র্যাকিং দেখলেও বোঝা যায়, আর্জেন্টিনার আক্রমণ প্রায়ই প্রতিপক্ষের বক্সে গিয়ে শেষ হচ্ছে, যেখানে ছোট একটি ভুলই পেনাল্টিতে পরিণত হচ্ছে। প্রশ্ন এখন একটাই—২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ দিকেও কি এই ধারা অব্যাহত থাকবে!
২০২৬ বিশ্বকাপ: তিন পেনাল্টি, গোল মাত্র একটি
চলতি বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত আর্জেন্টিনা তিনটি পেনাল্টি পেয়েছে। এর মধ্যে মাত্র একটি সফল হয়েছে। জর্ডানের বিপক্ষে স্পট কিক থেকে গোল করেছেন লাওতারো মার্টিনেজ। অন্যদিকে অস্ট্রিয়া ও মিশরের বিপক্ষে পাওয়া পেনাল্টি থেকে গোল করতে পারেননি লিওনেল মেসি। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বড় মুহূর্তে যিনি অসংখ্যবার দলকে উদ্ধার করেছেন, তার কাছ থেকে এমন ব্যর্থতা কিছুটা অস্বাভাবিক বলেই মনে হয়েছে।
তবে এই পরিসংখ্যানের আরেকটি দিকও আছে। গোল না হলেও আর্জেন্টিনা নিয়মিত পেনাল্টির পরিস্থিতি তৈরি করছে। অর্থাৎ আক্রমণের চাপ ও প্রতিপক্ষের ওপর আধিপত্য আগের মতোই রয়েছে। এই তিনটি পেনাল্টির ধরনও ছিল ভিন্ন। কখনো এসেছে দ্রুত গতির ড্রিবলের পর, কখনো ক্রস ঠেকাতে গিয়ে ডিফেন্ডারের ভুলে। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ প্রতিপক্ষকে এমন অবস্থায় ফেলেছে, যেখানে ফাউল করার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
কাতার ২০২২: পাঁচ পেনাল্টি, চার গোল
২০২২ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার পেনাল্টি গল্প ছিল আরও সফল। গ্রুপ পর্বে সৌদি আরবের বিপক্ষে লিওনেল মেসি স্পট কিক থেকে গোল করেন। পরে পোল্যান্ডের বিপক্ষে পেনাল্টি পেলেও তা কাজে লাগাতে পারেননি। এরপর নকআউট পর্বে আসে আরও তিনটি পেনাল্টি। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল, ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনাল এবং ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। তিনটিতেই সফল হন মেসি।
কেন এত পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা?
এর প্রথম উত্তর লুকিয়ে আছে তাদের খেলার ধরনে। আর্জেন্টিনা অনেক সময় প্রতিপক্ষের অর্ধে প্রেসিং করে বল পুনরুদ্ধার করে এবং দ্রুত আক্রমণে যায়। উইঙ্গাররা জায়গা তৈরি করে, ফুলব্যাকরা ওভারল্যাপ করে, আর মাঝমাঠের খেলোয়াড়রা ছোট ছোট পাসে বক্সের ভেতরে ঢোকার সুযোগ খোঁজেন। এই ধরনের ফুটবলে ডিফেন্ডারদের অনেক সময় শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আর সেই তাড়াহুড়ো থেকেই আসে ট্যাকল, হ্যান্ডবল বা শরীরের অনিচ্ছাকৃত সংস্পর্শ।
এখানে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর)-এর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক ফুটবলে এমন অনেক ফাউলও ধরা পড়ে, যা আগের সময়ে হয়তো চোখ এড়িয়ে যেত। দ্বিতীয় কারণ হলো আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত দক্ষতা। লিওনেল মেসি এখনো একাধিক ডিফেন্ডারকে টেনে নিজের দিকে আনেন এবং বক্সের আশপাশে প্রতিপক্ষকে অস্বস্তিতে ফেলেন। লাওতারো মার্টিনেজের বক্সের ভেতরে তীক্ষ্ণ দৌড়, বিশেষ করে প্রথম পোস্টে আক্রমণ, ডিফেন্ডারদের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। মাঝমাঠের খেলোয়াড়দের কাছাকাছি নিয়ন্ত্রণ ও দ্রুত পাসের কারণে প্রতিপক্ষকে প্রায়ই ঝুঁকিপূর্ণ চ্যালেঞ্জ নিতে হয়।
ইংল্যান্ড, ব্রাজিল, পর্তুগাল কিংবা ফ্রান্সের মতো দলগুলোতে একাধিক খেলোয়াড় আক্রমণের দায়িত্ব ভাগ করে নেয়। কিন্তু আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে মেসি, মার্টিনেজসহ মূল আক্রমণকারীরা বেশি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে বক্সে উপস্থিত থাকেন। তাই পেনাল্টির সম্ভাবনাও বাড়ে।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ লুৎফর রহমান হীরা
হেড অফিসঃ ১/ জি,আদর্শ ছায়ানীড়, রিংরোড, শ্যামলী, আদাবর ঢাকা - ১২০৭।
স্বত্ব © ২০২৬ চলনবিলের সময়