বাংলাদেশে হামের উদ্বেগজনক প্রাদুর্ভাব: ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি

: মেহেদী হাসান (স্টাফ রিপোর্টার) সাতক্ষীরা
প্রকাশ: 4 days ago

36

বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) বলছে,বর্তমানে দেশের ৬১টি জেলায় এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গে আরও পাঁচজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে, আক্রান্তদের মধ্যে ৮৩ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী ২০ এপ্রিল থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দেশজুড়ে একযোগে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হবে।

ভয়াবহ আক্রান্তের চিত্র ও বর্তমান পরিস্থিতি
১৫ মার্চ থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে হামে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর মিছিল লম্বা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী:
মৃত্যুর সংখ্যা:গত এক মাসে হামে সরাসরি আক্রান্ত হয়ে ৩৭ জনের এবং হামের লক্ষণ নিয়ে ১৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ মোট মৃত্যুর সংখ্যা ২১১ জন।

আক্রান্তের হার: এই সময়ে প্রায় ৩,১৯২ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে এবং ২০,৩৫২ জন সন্দেহভাজন রোগী হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন।

হাসপাতালে ভর্তি: মোট ১৩,৮৯৮ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে, যাদের মধ্যে বর্তমানে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১১,২৪৩ জন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগটি অত্যন্ত সংক্রামক। সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে এটি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ বা অন্ধত্বের মতো জটিল সমস্যার কারণ হতে পারে।

কেন এই বিপর্যয়?
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদী অবহেলার ফলেই আজকের এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

টিকার অভাব: আক্রান্ত ৬৬ শতাংশ শিশুরই টিকার একটি ডোজও গ্রহণ করা ছিল না।

*হার্ড ইমিউনিটির অভাব: করোনা মহামারি পরবর্তী সময়ে রুটিন টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন এবং টিকার প্রতি অনীহার কারণে গোষ্ঠীগত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ‘হার্ড ইমিউনিটি’ ভেঙে পড়েছে।

পরিকল্পনায় স্থবিরতা: নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া এবং মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্মবিরতির মতো ঘটনাগুলো এই পরিস্থিতির পেছনে দায়বদ্ধ।
রোগতত্ত্ব ও রোগনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এর সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, “হার্ড ইমিউনিটি গড়তে অন্তত ৯৫ শতাংশ টিকার কাভারেজ প্রয়োজন। টিকার পর্যাপ্ত প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলেই এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।”

সরকারের পদক্ষেপ :
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার প্রস্তুত। তিনি আরও জানান, দেশে টিকার কোনো সংকট নেই।

কর্মসূচির মূল দিকসমূহ:

১. দেশব্যাপী ক্যাম্পেইন: ২০ এপ্রিল থেকে দেশের প্রতিটি উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের স্থায়ী কেন্দ্রে টিকা দেওয়া হবে।
২. লক্ষ্যমাত্রা: ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী সব শিশুকে এক ডোজ হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হবে। যারা আগে টিকা নিয়েছে বা হামে আক্রান্ত হয়েছে, তাদেরও এই ক্যাম্পেইনে টিকা দেওয়া হবে।
৩. নিরাপত্তা:সরকারি ছুটির দিন ব্যতীত প্রতিদিন সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত এই কার্যক্রম চলবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ধারণা, বর্তমান টিকাদান পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে পরবর্তী দেড় মাসের মধ্যেই হামের প্রাদুর্ভাব নিম্নগামী হবে। তবে চিকিৎসকরা অভিভাবকদের সচেতন থাকার এবং শিশুকে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শে আইসোলেশনে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।