স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সীমিত রাজস্ব এবং দক্ষ জনশক্তির ঘাটতির মতো কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের কারণে এই বাজেটের কার্যকারিতা নিয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন নীতিনির্ধারক ও অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা না গেলে এই বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন জানান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও প্রযুক্তি— এই তিন খাতের সমন্বিত উন্নয়ন ছাড়া বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের ফাঁদ থেকে বের হতে পারবে না। তিনি মনে করেন, বাজেটে এই খাতগুলোতে অগ্রাধিকার দেওয়া ইতিবাচক হলেও বাস্তবায়ন কাঠামো শক্তিশালী না হলে এর সুফল সীমিত থাকবে। বিশেষ করে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরই বাজেট প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে। এতে দক্ষ মানব সম্পদ উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
অন্য দিকে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের চেয়ারম্যান ও ল্যাবএইড হাসপাতাল ও লাইফপ্লাস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম স্বাস্থ্যখাতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তার ভাষায়, একটি অসুস্থ জনগোষ্ঠী দিয়ে কখনোই উৎপাদনশীল অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বাড়ানো হলেও তা এখনও পর্যাপ্ত নয়। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, চিকিৎসক ও নার্সের ঘাটতি পূরণ এবং স্বাস্থ্যবীমা চালু করা এখন সময়ের দাবি।
তিনি আরও বলেন, টেলিমেডিসিন, ডিজিটাল হেলথ রেকর্ড এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে দেশে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি দূর করতে যৌথ উদ্যোগে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতাকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সীমিত রাজস্ব আহরণ এবং ঋণের চাপ—এই প্রেক্ষাপটে বাজেটের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তার মতে, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না; সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রযুক্তিখাত প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন ও আইসিটি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও দক্ষ জনশক্তির অভাব বড় বাধা। প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়নে সমান গুরুত্ব না দিলে এই খাতের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাবে না।
সাকিফ শামীম বলেন, স্বাস্থ্যখাতকে মানবসম্পদ উন্নয়নের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এ খাতে বরাদ্দ এখনও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় কম। বাজেটে স্বাস্থ্যসেবা জোরদার এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, চিকিৎসক ও নার্সের ঘাটতি পূরণ এবং ওষুধ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে। এ বাস্তবতায় টেলিমেডিসিন, ডিজিটাল হেলথ রেকর্ড এবং স্বাস্থ্যবীমা চালুর উদ্যোগগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমানে দেশের অধিকাংশ মানুষ নিজের পকেট থেকে চিকিৎসা ব্যয় বহন করে, যা দারিদ্র্য ঝুঁকি বাড়ায়। কার্যকর স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থা চালু করা গেলে এই চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, বেসরকারি খাতের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশে প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য একজন পোস্টগ্রাজুয়েট চিকিৎসকও নেই, যা স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে বড় বাধা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে দ্রুত পাইলট প্রকল্প গ্রহণের তাগিদও দিয়েছেন তিনি।
সাকিফ শামীম আরও বলেন, শিক্ষাখাতের ক্ষেত্রে বাজেট বরাদ্দ পরিমাণগত দিক থেকে উল্লেখযোগ্য হলেও গুণগত রূপান্তরের প্রশ্নটি এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে। মোট বরাদ্দের একটি বড় অংশ প্রাথমিক ও অবকাঠামোগত ব্যয়ে সীমাবদ্ধ, যেখানে ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন দক্ষতা-ভিত্তিক মানবসম্পদ। বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং শিল্প-সংযুক্ত শিক্ষাব্যবস্থার ওপর অধিক জোর দেওয়া জরুরি। বর্তমান বাজেটে এ খাতের গুরুত্ব স্বীকার করা হলেও বরাদ্দ ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে এখনও ফাঁক রয়ে গেছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডাটা অ্যানালিটিক্স, রোবোটিক্স ও ডিজিটাল স্কিল- এই নতুন প্রজন্মের দক্ষতাকে মূলধারার শিক্ষায় সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রয়োজন। অন্যথায়, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড দ্রুতই ডেমোগ্রাফিক বার্ডেনে রূপ নিতে পারে।
তার মতে, কারিগরি শিক্ষাকে কেন্দ্র করে একটি বাস্তবভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। সরকার চাইলে নীতিগত প্রণোদনা, কর-সুবিধা এবং সহজ অর্থায়নের মাধ্যমে বেসরকারি খাতে আধুনিক কারিগরি ও স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পথ সুগম করতে পারে। বিশেষ করে শিল্পাঞ্চল ও প্রান্তিক এলাকায় পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ মডেলে প্রযুক্তিনির্ভর ট্রেনিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করলে স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরি সম্ভব হবে। এতে একদিকে যেমন তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে, অন্যদিকে শিল্পখাতও প্রয়োজনীয় দক্ষ শ্রমশক্তি পাবে-যা সামগ্রিকভাবে বেকারত্ব হ্রাস ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সুতরাং, কারিগরি শিক্ষাকে মূলধারার অর্থনৈতিক কৌশলের সাথে যুক্ত করে পরিকল্পিত বিনিয়োগ নিশ্চিত করাই হবে সময়োপযোগী ও কার্যকর পদক্ষেপ।
তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্যখাত মানবসম্পদ উন্নয়নের আরেকটি অপরিহার্য স্তম্ভ, যা প্রায়শই অবকাঠামোগত উন্নয়নের আড়ালে অবমূল্যায়িত হয়। বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদারের ওপর গুরুত্ব আরোপ ইতিবাচক হলেও সামগ্রিক ব্যয় এখনও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় কম। একটি সুস্থ জনগোষ্ঠী ছাড়া উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি সম্ভব নয়-এই মৌলিক সত্যটি নীতিনির্ধারণে আরও গভীরভাবে প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, চিকিৎসক ও নার্সের ঘাটতি পূরণ, এবং ওষুধ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।
টেলিমেডিসিন, ডিজিটাল হেলথ রেকর্ড এবং স্বাস্থ্যবীমা চালুর মতো উদ্যোগগুলো মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে সাহায্য করবে। বর্তমানে অনেক মানুষ নিজের পকেট থেকে চিকিৎসার খরচ বহন করে, যা তাদের অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করে তোলে। যদি স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থা কার্যকরভাবে চালু করা যায়, তাহলে এই চাপ অনেকটাই কমবে। ফলে মানুষ আরও বেশি নিরাপদ ও উৎপাদনশীল হতে পারবে, যা সরাসরি মানবসম্পদ উন্নয়নে সহায়ক। প্রযুক্তিখাত বর্তমানে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বাজেটে ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন, ব্রডব্যান্ড সংযোগ বৃদ্ধি এবং আইসিটি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার পরিকল্পনা ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক।
তবে এখানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো দক্ষ জনশক্তির অভাব। শুধু প্রযুক্তি অবকাঠামো তৈরি করলেই হবে না, সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করার জন্য দক্ষ মানবসম্পদও তৈরি করতে হবে। বাজেটে ৫জি প্রযুক্তি, ডাটা সেন্টার এবং ডিজিটাল গভর্ন্যান্সের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা দেশের ডিজিটাল রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করবে। তবে গ্রামীণ এলাকাগুলোতে প্রযুক্তির সুবিধা পৌঁছে দেওয়া এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ডিজিটাল বিভাজন কমাতে হলে গ্রাম ও শহরের মধ্যে প্রযুক্তিগত ব্যবধান কমানো জরুরি। এতে করে দেশের প্রতিটি মানুষ সমানভাবে প্রযুক্তির সুবিধা নিতে পারবে এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ লুৎফর রহমান হীরা
হেড অফিসঃ ১/ জি,আদর্শ ছায়ানীড়, রিংরোড, শ্যামলী, আদাবর ঢাকা - ১২০৭।
স্বত্ব © ২০২৫ চলনবিলের সময়