এক দিন বাদেই কোরবানির ঈদ। অথচ রাজধানীর মার্কেটপাড়াগুলোর দিকে তাকালে তেমনটি খুব একটা বোঝা যাচ্ছে না। বিপণিবিতানগুলোতে পোশাক, জুতা, পাঞ্জাবি, প্রসাধনী, অলংকারসহ নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে কাঙ্ক্ষিত ক্রেতার দেখা পাচ্ছেন না বিক্রেতারা। অলস সময় কাটাচ্ছেন বিক্রয়কর্মীরা। একই চিত্র পাইকারি বাজারেও। তবে, ব্যতিক্রমী চিত্র ফুটপাতের ভাসমান দোকানগুলোতে। সেখানে ক্রেতার ভিড় তুলনামূলক বেশি।
মার্কেট ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত শুক্র ও শনিবার ভালো বাণিজ্য হয়েছে তাদের। কিন্তু অন্যান্য দিনে ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না। ঈদের বাজার ধরতে এবারও বাড়তি বিনিয়োগ করেছেন তারা। কোরবানি ঈদকে কেন্দ্র করে বড় বাণিজ্যের আশা ছিল তাদের। কিন্তু ব্যবসা কম হওয়ায় হতাশ হতে হয়েছে তাদের। তারপরও যতটুকু বিক্রি হয়েছে, তাকে ‘মন্দের ভালো’ বলছেন ব্যবসায়ীরা।
রাজধানীর গুলিস্তানে রয়েছে পোশাকের বেশ কয়েকটি পাইকারি মার্কেট। এর মধ্যে অন্যতম ঢাকা ট্রেড সেন্টার। সাধারণত কোরবানির ঈদের এক মাস আগে থেকেই এ মার্কেটে ব্যস্ততা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। মার্কেটের সামনে ছোট-বড় বিভিন্ন পরিবহনে দিনভর চলে পণ্য লোডিং। কিন্তু এবার এখানকার চিত্র অনেকটাই আলাদা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দুই বছর ধরেই বাণিজ্যে ভাটা যাচ্ছে তাদের। মূলত, ঢাকার বাইরে থেকে পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যবসা কমেছে তাদের।
এ মার্কেটের পাইকারি প্রতিষ্ঠান কমফোর্ট জোনের ব্যবসায়ী মো. দুলাল হোসেন কালবেলাকে বলেন, ঈদ উপলক্ষে ঋণ করে বাড়তি বিনিয়োগ করেছি। এ সিজনে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার গেঞ্জি ও শার্টের বিক্রির টার্গেট ছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত ৩ লাখ টাকাও ব্যবসা হয়নি। কোরবানির ভালো সিজনে দৈনিক ৫০ থেকে ৬০ হাজার, এমনকি ১ লাখ টাকাও বিক্রি করেছি। এবার সেখানে দৈনিক ২০ হাজার টাকাও হচ্ছে না। মূলত, মূল্যস্ফীতির চাপে পোশাকে আগের মতো খরচ করছে না মানুষ। এতে চাহিদা কমেছে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরের জেলাগুলো থেকে অর্ডার অনেক কমে গেছে। এতেই আমাদের ব্যবসা কমে গেছে।
একই কথা জানান এখানকার বুসরা ফ্যাশনের পাইকারি ব্যবসায়ী মো. বিল্লাল হোসেনও। তিনি বলেন, আমাদের হিসাবে এপ্রিল মাস থেকেই বিভিন্ন জেলা থেকে অর্ডার পাওয়ার কথা। সেভাবেই বিনিয়োগ করেছি। কিন্তু মে মাসের শেষ ভাগে এসে বিক্রি শুরু হয়েছে। তা-ও অর্ডার খুবই কম। একদিকে কাপড়ের দাম বাড়ায় পণ্যের দাম বেড়েছে, অন্যদিকে মানুষেরও কেনাকাটা সীমিত হয়ে গেছে। চাহিদার ওপর এর প্রভাব পড়েছে।
পাইকারি বিক্রেতারা জানান, পোশাকের প্রতিটি আইটেমের পাইকারি দর পিসপ্রতি ২০ থেকে ৫০ টাকা বাড়তি রয়েছে। এবার গেঞ্জি আইটেম ১৮০ থেকে ৫০০ টাকা, শার্ট ২৫০ থেকে ১ হাজার, জিন্স ও গ্যাবার্ডিন প্যান্ট ৪০০ থেকে ১ হাজার ২০০ এবং বাচ্চাদের জামা ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। মান ও ব্র্যান্ড ভেদে আর বেশি দামেরও রয়েছে।
এদিকে খুচরা বিক্রেতারাও বলছেন, ঈদ উপলক্ষে পোশাক, জুতা, প্রসাধনী ও অলংকারের মতো পণ্যের কেনাকাটা আগের চেয়ে কমেছে। এতে ঈদের মতো মৌসুমেও মানুষের ঢল নামছে না মার্কেট পাড়াগুলোতে।
গত রবি ও সোমবার রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মার্কেটগুলোর বিপণিবিতাণগুলোতে ক্রেতাদের খুব একটা ভিড় নেই। অনেকটা সাধারণ দিনগুলোর মতোই চলছে বেচাকেনা। যারা কেনাকাটা করতে এসেছেন তাদের বেশিরভাগই ভিড় করছেন পোশাক ও জুতার দোকানে।
এ মার্কেটের শিলং ম্যাচিং সেন্টারের ব্যবসায়ী মো. হিরণ কালবেলাকে বলেন, ঈদ বাজারের তুলনায় এবার ব্যবসা অর্ধেকেরও নিচে নেমে গেছে। এবার ক্রেতার ভিড় নেই। আগে এমন সময় দৈনিক ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকার পোশাক বিক্রি করেছি। এখন ২০ হাজার টাকাও হচ্ছে না। ব্যবসা এখন শুধু শুক্রবারকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। তারপরও যা হচ্ছে, তা মন্দের ভালো। এ দিয়ে অন্তত কর্মচারীদের বেতন ও দোকান খরচ উঠে যাবে।
শোয়াইব ফেব্রিক্সের ব্যবসায়ী মো. আজিম মাতবর বলেন, ঈদের আগে শার্ট-প্যান্ট পিসের বিক্রি ও বানানোয় ব্যস্ত সময় পার করার কথা। অথচ এখন স্বাভাবিক সময়ের মতোই ব্যবসা চলছে। বাড়তি চাহিদা নেই।
তবে ফুটপাতের ভাসমান দোকানগুলোতে তুলনামূলক ভিড় বেশি। বিক্রেতারা জানান, কাঙ্ক্ষিত ব্যবসা না হলেও স্বাভাবিকের চেয়ে বিক্রি বেড়েছে তাদের।
নিউমার্কেট ওভারব্রিজের ধারে মেয়েদের টু-পিস, ছেলেদের ও মেয়েদের প্যান্ট বিক্রি করেন মো. জহির হোসাইন। তিনি বলেন, আশানুরূপ বেচাবিক্রি নেই। দৈনিক গড়ে ৫ হাজার টাকাও বিক্রি করতে পারতেছি না। যদিও গত শুক্রবার ২০ হাজার টাকা ও শনিবার ৮ হাজার টাকার বিক্রি হইছে। এরপর আর বিক্রি নাই। এখন আবার বৃষ্টি-বাদল। আজ (সোমবার) দুপুর নাগাদ বিক্রি শুধু ১ হাজার টাকা। দাম সম্পর্কে তিনি বলেন, টু-পিস ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা, ছেলেদের জিন্স প্যান্ট ৪০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, মেয়েদের পালাজো ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা এবং জেগিন্স ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করছি।
টি-শার্ট বিক্রেতা মো. সামির মোহাম্মদ বলেন, আগে ঈদের সময় বিক্রি বাড়ত। এবার ফুটবল বিশ্বকাপের কারণে জার্সির বাজার আমাদের ব্যবসা নিয়ে নিছে। এখন দৈনিক ৫-৬ হাজার টাকা বিক্রি করতেও কষ্ট হচ্ছে।
পাশের ফুটপাতের দোকানি মো. ইমাম হাসানও বলেন, সামনে বিশ্বকাপ হওয়ায় ঈদবাজারে টি-শার্টের সঙ্গে জার্সিও তুলেছি। তবে, জার্সির বিক্রিই বেশি। দৈনিক ১৫-২০টি বিক্রি করছি। দাম ২৫০ থেকে ৬০০ টাকা পড়ছে।
জুতার বিক্রেতা মো. সজিব কাজী বলেন, এবার ঈদবাজার খুবই মন্দা। তারপরও নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো। গত শুক্র-শনিবার ব্যবসা ভালো হইছে। শুক্রবার ২৮ থেকে ৩০ জোড়া জুতা বিক্রি করেছি। বাকি দিনগুলো গড়ে ১২-১৫ জোড়া বিক্রি হয়েছে।
এদিকে, রাজধানীর বায়তুল মোকাররম মসজিদ এলাকায় টুপি ও আতরের খুচরা বিক্রি বেড়েছে বলে জানান ভাসমান বিক্রেতা মো. হাফিজ উদ দৌলা। তিনি বলেন, ঈদে গুলিস্তান হয়ে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার পথে অনেকেই এখান থেকে আতর, টুপি, জায়নামাজ ও তজবিহ কিনে নিয়ে যান। এতে বিক্রি বাড়ে। এবার সেভাবে না বাড়লেও যতটুকু বেড়েছে তা মন্দ নয়। তবে, দামি পণ্যের চেয়ে কম দামের পণ্যে ক্রেতাদের ঝোঁক বেশি। এতে লাভ কমেছে।
মূল্যস্ফীতির চাপে ঈদ মৌসুমে মানুষের কেনাকাটার প্রবণতায় প্রভাব ফেললেও এবার পোশাক, জুতা, কসমেটিকস ও ফ্যাশন খাতের বাণিজ্যে সারা দেশে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হতে পারে বলে আশা করছে বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতি। যদিও এ হিসাব চূড়ান্ত পরিসংখ্যান নয় বলে জানিয়েছে সংগঠনটি। সাম্প্রতিক বাজার প্রবণতা ও পূর্ববর্তী ঈদ অর্থনীতি এবং খুচরা বাজার পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে এ হিসাব করা হয়েছে।
সমিতির সভাপতি মো. নাজমুল হাসান মাহমুদ কালবেলাকে বলেন, সাধারণত দেশের মোট ঈদ বাণিজ্যের প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ লেনদেন হয় ঢাকা মহানগরীকেন্দ্রিক। এবার কোরবানির ঈদে আমরা ধারণা করছি ঢাকা মহানগরীতে পোশাক ও ফ্যাশন খাতে ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা এবং খাদ্য, মসলা, সুপারশপ ও রেস্টুরেন্ট খাতে ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হবে। পরিবহন, কুরিয়ার, ই-কমার্স, অন্যান্য সেবা খাতে ১০ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হবে। এ ছাড়া দা, ছুরি, চাপাতি, বঁটি—এসবের বাজারে প্রায় ২ থেকে ৩ হাজার কোটি টাকার পণ্য কেনাবেচা হতে পারে।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ লুৎফর রহমান হীরা
হেড অফিসঃ ১/ জি,আদর্শ ছায়ানীড়, রিংরোড, শ্যামলী, আদাবর ঢাকা - ১২০৭।
স্বত্ব © ২০২৫ চলনবিলের সময়