নতুন সূর্যের আলোয় আবারও জেগে ওঠার সময়। পুরোনো ক্লান্তি, ভয় আর অস্থিরতাকে পেছনে ফেলে বাঙালি প্রস্তুত এক নতুন শুরুতে। ঋতুচক্রের এই অবিরাম ঘূর্ণনে পহেলা বৈশাখ কেবল একটি দিন নয়, এটি নবজাগরণের প্রতীক—মানুষে মানুষে বন্ধন, সাহস আর সহমর্মিতার পুনর্নবীকরণের আহ্বান। সেই চিরন্তন ডাকে সাড়া দিয়ে মানবতা ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে আবারও বর্ষবরণে নামছে ছায়ানট।
চলে এলো ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি নির্বিশেষে বাঙালি প্রস্তুত তার সর্ববৃহৎ উৎসব উদযাপনে। সব ধরনের সংস্কৃতিবিরোধী অপশক্তিকে উপেক্ষা করে নতুন বছরের প্রভাতে মানবতা, সাহস ও সাম্যের বার্তা ছড়িয়ে দিতে প্রস্তুত ছায়ানট।
রোববার (১২ এপ্রিল) বিকাল ৪টায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির নেতারা এবারের আয়োজনের বিস্তারিত তুলে ধরেন। জানানো হয়, বরাবরের মতো রাজধানীর রমনা উদ্যান-এ অনুষ্ঠিত হবে ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ অনুষ্ঠান।
আয়োজকদের ভাষায়, ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’—এই চেতনার মধ্যেই নিহিত বাঙালির অগ্রযাত্রার শক্তি। তাই এবারের আয়োজনেও মুক্তচিন্তা, মানবিকতা ও নির্ভীক মানস গঠনের বার্তাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। বিগত বছরের সব প্রতিকূলতা পেছনে ফেলে নতুন বছরে আরও মানবমুখী সমাজ গড়ার প্রত্যাশা তাদের।
বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। এক বিবৃতিতে বলা হয়, যখন বাঙালি বর্ষবরণের আনন্দে মেতে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ-সংঘাত ও ধ্বংসযজ্ঞ মানবজীবনকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ছায়ানট বিশ্বমানবতার শান্তি, কল্যাণ ও সম্প্রীতির কামনা করেছে। তাদের স্বপ্ন—বিশ্বজুড়ে মানবতা, সংহতি ও সহাবস্থানের ফুল ফুটুক।
নববর্ষের দিন সূর্যোদয়ের সঙ্গে সকাল সোয়া ছয়টায় শুরু হবে এই আয়োজন। সুর, বাণী ও ছন্দে গাঁথা পরিবেশনায় উঠে আসবে দেশপ্রেম, মানবতা ও লোকজ জীবনের নানা অনুষঙ্গ। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী এই আয়োজনে অংশ নেবেন প্রায় দুইশো শিল্পী। পরিবেশনায় থাকবে ৮টি সম্মেলক গান, ১৪টি একক পরিবেশনা এবং ২টি আবৃত্তি।
এবারের অনুষ্ঠানে বিশেষভাবে স্মরণ করা হবে প্রখ্যাত গণসংগীতশিল্পী সলিল চৌধুরী-এর জন্মশতবর্ষ এবং গীতিকার-সুরকার মতলুব আলী-কে। তাদের সৃষ্টিকর্মের মধ্য দিয়ে তুলে ধরা হবে সংগীতের সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিক শক্তি।
সংবাদ সম্মেলনে ছায়ানটের সভাপতি ডা. সারওয়ার আলী বলেন, ছায়ানটের সূচনা ছিল কেবল একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ছিল বাঙালির আত্মপরিচয় ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে জড়িত এক বৃহত্তর আন্দোলন। সময়ের পরিবর্তন হলেও সেই চেতনার ধারাবাহিকতা আজও বহমান। তবে বর্তমান সময়ে জাতীয় সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে, কারণ কিছু শক্তি এখনো আমাদের শিকড়কে দুর্বল করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখ উদযাপন কেবল উৎসব নয়; এটি বাঙালি পরিচয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশভঙ্গি। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা ইঙ্গিত দেয়, এই সাংস্কৃতিক ধারাকে ব্যাহত করার অপচেষ্টা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
সহ-সভাপতি পার্থ তানভীর নভেদ বলেন, নিরাপত্তার স্বার্থে একটি নির্দিষ্ট মিডিয়া সেন্টার থাকবে। সেখানে প্রবেশের জন্য সাংবাদিকদের পরিচয়পত্র প্রদর্শন করতে হবে। তিনি বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সীমিত পরিসরে সবাইকে সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে, যা অনুষ্ঠান পরিচালনায় বিঘ্ন ঘটাতে পারে। তাই শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমেদ লিসা বলেন, ‘আমরা শঙ্কাহীনভাবে গান গাইতে চাই। শঙ্কা থাকুক বা না থাকুক, আমাদের গান থামবে না।’ তিনি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে ছায়ানটের ভবন আক্রান্ত হলেও সংগঠনটি এক সপ্তাহের মধ্যেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সংগতি সমাবেশে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই তাদের প্রধান শক্তি।
তিনি আরও বলেন, প্রতিবছর এই আয়োজনে লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটে। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা ছাড়া নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তবে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলেও, এই ব্যবস্থাই অনুষ্ঠান নির্বিঘ্ন রাখতে সহায়ক। তিনি আশা প্রকাশ করেন, একদিন এমন সময় আসবে যখন এই নিরাপত্তা বেষ্টনী ছাড়াই সবাই স্বাধীনভাবে সাংস্কৃতিক আয়োজন উপভোগ করতে পারবে।
অনুষ্ঠানটি একযোগে সম্প্রচার করবে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ও দীপ্ত টেলিভিশন। এছাড়া অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সরাসরি সম্প্রচার করবে প্রথম আলো এবং বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছায়ানটের ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক পেজ থেকেও অনুষ্ঠানটি সরাসরি দেখা যাবে। বিলম্বিত সম্প্রচার করবে চ্যানেল আই।
আয়োজনটি নির্বিঘ্ন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি কাজ করছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। ছায়ানটের কর্মীদের সঙ্গে সহযোগিতায় যুক্ত রয়েছে থার্টিনথ হুসার্স ওপেন রোভার গ্রুপ ও এজিস সার্ভিসেস লিমিটেড। মঞ্চসজ্জার দায়িত্বে আছেন ছায়ানটের প্রাক্তনী শিল্পী মমিনুল হক দুলু ও রণজিত রায়।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ছায়ানটের সভাপতি ডা. সারওয়ার আলী, সহ-সভাপতি খায়রুল আনাম শাকিল ও পার্থ তানভীর নভেদ, সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমেদ লিসা এবং যুগ্ম সম্পাদক জয়ন্ত রায়।
আয়োজকদের আহ্বান, নির্বিঘ্ন সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ নিশ্চিত করতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। সহযাত্রীদের আন্তরিক সমর্থনেই এই আয়োজন সফল হবে—এই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তারা।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ লুৎফর রহমান হীরা
হেড অফিসঃ ১/ জি,আদর্শ ছায়ানীড়, রিংরোড, শ্যামলী, আদাবর ঢাকা - ১২০৭।
স্বত্ব © ২০২৫ চলনবিলের সময়