ছুটির দিন হওয়ায় কেউবা বাসায় শুয়ে-বসে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছিলেন। কেউ কেউ আবার ঘরের সাপ্তাহিক বাজার-সদাইয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এর মধ্যেই হঠাৎ দুলে ওঠে তাদের পৃথিবী। ঝাঁকুনি দিয়ে কাঁপতে শুরু করে সবকিছু। আতঙ্কিত মানুষ হুড়মুড় করে বাসাবাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন খোলা আকাশের নিচে। গতকাল শুক্রবার সকালে দেশে অনুভূত ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল নরসিংদীর একটি এলাকার চিত্র এটি।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সকাল ১০টা ৩৮ মিনিট ২৬ সেকেন্ডে ভূমিকম্পটি অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার মাঝারি ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর মাধবদীতে, যা ঢাকার ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্র থেকে ১৩ কিলোমিটার পূর্ব দিকে।
ভূমিকম্পে নরসিংদীর তিনটি উপজেলায় বাবা-ছেলেসহ ৫ জন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ভূমিকম্পের পর নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ঝাঁকুনিতে অনেকের ঘরের আসবাব পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক বহুতল ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে।
ঘোড়াশাল লেবুপাড়া গ্রামের ঘোড়াশাল ডেইরি ফার্মের শ্রমিক কামাল মিয়া জানান, ‘সকালে হঠাৎ মনে হচ্ছিল বোঁ বোঁ শব্দ হচ্ছে এবং আমাদের যেন কেউ জোরে জোরে নাড়াচ্ছে। হঠাৎ দেখি আমাদের ফার্মের মাঠে মাটি ফেটে দুভাগ হয়ে গেছে। আমাদের তখন মনে হয়েছে যে, এখনই আমাদের জীবনের শেষ সময়। হয়তো বা (ভূমিকম্প) আর কিছুক্ষণ থাকলে আমরা ভয়েই মারা যেতাম।’
একই ফার্মের পশু চিকিৎসক মাসুদ রানা বলেন, ‘সকালে হঠাৎ ভূমিকম্প অনুভূত হলে আমি দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে আসি। এসে দেখি ফার্মের গুরুগুলো লাফাচ্ছে, শ্রমিকরা এদিক-সেদিক দৌড়াদৌড়ি করছে। ফার্মের মাঠ ফেটে দুভাগ হয়ে গেছে। এমন ফাটল দেখে অনেক ভয় পেয়েছি।’
আফসার উদ্দিন নামে চরপাড়া এলাকার একজন সরকারি কর্মচারী বলেন, ‘আজ (শুক্রবার) ছুটির দিন। ভেবেছিলাম একটু সময় করে ঘুম থেকে উঠব। কিন্তু হঠাৎ বুঝতে পারি ঘরের পাখা নড়ছে, সঙ্গে ঘরে থাকা আসবাবও। এমনকি ঘরের শোকেসে থাকা কাচের তৈজসপত্র মেঝেতে পড়তে শুরু করে। আমি ভয়ে বিছানা থেকে উঠে আমার সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে ৬ তলা থেকে রাস্তায় নেমে যাই। ভবনটি এত জোরে দুলছিল যে, সবাই ভয়ে চিৎকার করতে করতে আমাদের সঙ্গে নিচে নেমে আসে।’
ঘোড়াশাল বাজার এলাকার আছমা বেগম নামে একজন বলেন, ‘আমি রান্নাঘরে ছিলাম, হঠাৎ বাড়ি দুলতে শুরু করলেও প্রথমে বুঝিনি। পরে জিনিসপত্র পড়তে শুরু করলে দ্রুত চারতলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামি। আমার ৩৫ বছরের জীবনে এমন তীব্র কম্পন আগে কখনো দেখিনি।’
প্রাণ-আরএফএল কোম্পানিতে কর্মরত কফিল উদ্দিন নামে একজন জানান, ‘ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে সোফায় বসে বাচ্চাদের সঙ্গে কার্টুন দেখছিলাম। হঠাৎ দেখি ঘরে থাকা সবকিছু দুলছে। রান্নাঘরে থাকা বিভিন্ন বাসনপত্র মেঝেতে পড়ে যাচ্ছে। তখন তাৎক্ষণিক সবাইকে নিয়ে দৌড়ে ভবন থেকে নেমে পড়ি। বাচ্চারা খুব ভয় পেয়েছে। এমন ভূমিকম্প আগে কখনো অনুভব করিনি।’
গোলাম ফারহানা আলভী নামে সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী অনুভূতি জানিয়ে বলে, ‘আমি বইয়ে ভূমিকম্পের কথা পড়েছি, কখনো দেখিনি, আজ দেখলাম। অভিজ্ঞতা খুবই ভয়াবহ। অনেক ভয় পেয়েছি।’
সুমন মিয়া নামে নরসিংদী শহরের গাবতলী এলাকার একজন শিক্ষক বলেন, ‘আমি সপ্তাহের বাজার প্রতি শুক্রবার করি। সে জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম বাজারে যাওয়ার। হঠাৎ সবকিছু নড়তে শুরু করে। ঘরে থাকা বিভিন্ন শোপিস মেঝেতে পড়ে ভেঙে যায়। এমন পরিস্থিতিতে আমি দৌড়ে পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে আমাদের ৫ তলা ভবনের তিনতলা থেকে নেমে পড়ি। এ সময় আমাদের ভবনের সবাই আতঙ্কে সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নামতে থাকে। আমরা সবাই খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিই।’
নরসিংদী সদর হাসপাতাল, জেলা হাসপাতাল ও জেলার বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কমপক্ষে দেড় শতাধিক মানুষ আহত হয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছে। এ ছাড়া ভূমিকম্পে জেলার প্রায় সব উপজেলায় বেশ ক্ষতি হয়েছে। নরসিংদী শহরের এবং ঘোড়াশাল বাজার এলাকার অনেক ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে। তার মধ্যে পলাশ উপজেলার ঘোড়াশাল পৌর এলাকার নতুনবাজার গ্রামের ইশাক মিয়ার বাড়ি ভেঙে পড়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে ভূমিকম্পে পলাশ উপজেলার ঘোড়াশাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সাব-স্টেশনে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে যন্ত্রাংশ পুড়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডের সাব-স্টেশন বন্ধ রয়েছে। পলাশ ফায়ার সার্ভিসের স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার মো. আব্দুস শহীদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিটের চেষ্টায় ৩০ মিনিটের মধ্যেই আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ লুৎফর রহমান হীরা
হেড অফিসঃ ১/ জি,আদর্শ ছায়ানীড়, রিংরোড, শ্যামলী, আদাবর ঢাকা - ১২০৭।
স্বত্ব © ২০২৫ চলনবিলের সময়