মাসে নয়, ভ্যাট দিতে হবে তিন মাস অন্তর বাজেটে নতুন বিধান প্রস্তাব

: চলনবিলের সময় ডেস্ক
প্রকাশ: 4 hours ago

4

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স (ভ্যাট) রিটার্ন প্রতি মাসের পরিবর্তে তিন মাস অন্তর করার নতুন বিধান হচ্ছে। এতে সুবিধার চেয়ে অসুবিধা বেশি হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, নতুন নিয়মের কারণে পরোক্ষ এই করের টাকা ব্যবসায়ীদের কাছে জমে থাকলে খেলাপির ঝুঁকি তৈরি হবে। একই সঙ্গে তিন মাস অন্তর রিটার্ন জমার কারণে সরকারের তাৎক্ষণিক অর্থ সংকটও তৈরি হতে পারে। নতুন এই নিয়মে অসাধু ব্যবসায়ীরা সুবিধাভোগী হলেও স্বচ্ছ ব্যবসায়ীরা পড়বেন জটিলতায়।

জানা গেছে, সরকারের আয়ের বড় অংশ আসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে। প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকার এনবিআরের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। সংস্থাটির ইনকাম ট্যাক্স, ভ্যাট ও কাস্টমস তিন অনুবিভাগ মিলে এই অর্থ আদায় করবে। যা সরকারের মোট আয়ের প্রায় সাড়ে ৮৬ শতাংশ। বিশাল পরিমাণের এই অর্থ (প্রায় ২ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা) আসবে পরোক্ষ কর অর্থাৎ ভ্যাট থেকে। এনবিআরের আদায় করা অর্থের সঙ্গে বাড়তি আরও ঋণ ও অনুদান এনে ব্যয় নির্বাহ করে সরকার। প্রস্তাবিত আগামী অর্থবছরের বাজেটে ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে ভ্যাট রিটার্ন জমার সময়সীমা এক মাস থেকে বাড়িয়ে তিন মাস করার প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সরকারের ব্যয়ে মূলত এসব অর্থ ব্যবহার হয়ে থাকে। চলতি অর্থবছরেও প্রতি মাসে রিটার্ন জমার কারণে মাস শেষে সরকারি হিসাবে করের টাকা জমা হয়ে যায়। আগামী অর্থবছরের ভ্যাটে তিন মাস অন্তর রিটার্ন জমার বাধ্যবাধকতার কারণে সরকারের নগদ অর্থ সরবরাহে চাপ তৈরি হবে। তৈরি হতে পারে তাৎক্ষণিক অর্থ সংকট। অর্থাৎ যেহেতু ভ্যাটের রিটার্ন জমার তিন মাসের সময় রয়েছে, তাই প্রথম ও দ্বিতীয় মাসে কমে আসবে ভ্যাটের জমা। আর জমা অর্থ কমলে ব্যয় নির্বাহের জন্য বিকল্প উৎস খুঁজতে হবে। বিকল্প হিসেবে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিলে সরকারকে আলাদা সুদ দিতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনবিআরের ভ্যাট পলিসির দায়িত্ব পালন করা সাবেক সদস্য ড. আব্দুর রউফ কালবেলাকে বলেন, সরকারের প্রতি মাসের নির্দিষ্ট কিছু পরিচালনা ব্যয় ও উন্নয়ন ব্যয় থাকে। ভ্যাট প্রতি মাসে সরকারের কোষাগারে জমা না হয়ে ৩ মাস পর পর জমা হলে সরকারের তাৎক্ষণিক নগদ অর্থের সংকট তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া কোনো কারণে ব্যবসায় লোকসান বা বাজারের মন্দাভাব থাকলে, ভোক্তার কাছ থেকে সংগৃহীত ভ্যাটের টাকা আত্মসাৎ করার ঝুঁকি তৈরি হবে। ভোক্তার এই করের টাকা ব্যবসায়ীর কাছে ৩ মাস রাখা হলে আর্থিক ঝুঁকি তৈরি হবে। এ ছাড়া ব্যবসায়ীদের মধ্যে খেলাপি হওয়ার প্রবণতা থাকবে বলেও জানান এই সাবেক কর্মকর্তা।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভ্যাটের রিটার্ন জমার এই নতুন নিয়মের কারণে চলতি মূলধন হিসেবে অপব্যবহার করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া ৩ মাস পর যখন এককালীন একটি বড় অঙ্কের ভ্যাট পরিশোধের সময় আসবে, তখন অনেক ব্যবসায়ী যদি সেই অর্থ অন্য ব্যবসায়িক খাতে খাটিয়ে ফেলেন, তাহলে একসঙ্গে বড় অঙ্কের ভ্যাট পরিশোধে ব্যর্থ হবেন। আর যারা স্বচ্ছ উপায়ে হিসাব রক্ষণ করেন, তাদের জন্য এই পদ্ধতি সুবিধার চেয়ে জটিলতাই বেশি তৈরি করবে। ভ্যাটের আরেকটি বড় কর্মকাণ্ড রেয়াত। যদিও রেয়াত নিয়ে হয়রানির বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। তবুও প্রতি মাসে রেয়াত না নিয়ে ৩ মাস পর রেয়াত নিতে গেলে হিসাব মেলাতে হিমশিম খেতে হবে। সাপ্লাই চেইনের একটি প্রতিষ্ঠান ৩ মাস পর রিটার্ন দিলে, তার ক্রেতা বা বিক্রেতার রেয়াত দাবির সময়সীমা এবং ইনভয়েস ট্র্যাকিং জটিল হয়ে পড়বে। এ ছাড়া মাসিক রিটার্নে কোনো ভুল হলে পরবর্তী মাসেই তা সংশোধন করা সহজ। কিন্তু ত্রৈমাসিক পদ্ধতিতে একটি ভুলের প্রভাব দীর্ঘ ৩ মাসের ট্রানজেকশনের ওপর পড়বে। এর বাইরেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাঠ পর্যায়ের ভ্যাট অফিসগুলোর জন্য এই পদ্ধতি প্রশাসনিক জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে। যদিও এনবিআর বর্তমানে প্রতি মাসে দাখিলপত্র যাচাই-বাছাই করে ফাঁকি রোধে কাজ করে। ৩ মাসের ডাটা যখন একসঙ্গে ভ্যাট সার্কেল অফিসগুলোতে জমা পড়বে, তখন এত বেশি ট্রানজেকশন স্ক্রুটিনি বা অডিট করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। ভ্যাট বকেয়া পড়ার হার বাড়লে এনবিআরকে তা আদায়ের জন্য ঘন ঘন কারণ দর্শানোর নোটিশ, ডিমান্ড নোটিশ এবং সার্টিফিকেট মামলা করতে হবে। এতে রাজস্ব বিভাগের প্রশাসনিক ব্যয় এবং মামলার জট দুই-ই বাড়তে পারে। নতুন নিয়মের কারণে আরেকটি বড় জটিলতা হলো- ভোক্তা পণ্য ক্রয়ের সঙ্গে সঙ্গেই সরকারকে টাকা দিয়ে দিলেন, অথচ সরকার সেই টাকা নিজের কোষাগারে না এনে ৩ মাসের জন্য একজন মধ্যস্বত্বভোগী বা ব্যবসায়ীর কাছে বিনা সুদে গচ্ছিত রাখার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। আর ৩ মাস ধরে শত শত কোটি টাকা বাজারে ব্যবসায়ীদের হাতে আটকে থাকলে সরকার সেই অর্থের সময়মূল্য থেকে বঞ্চিত হবে। অনেক সময় সরকারকে তাৎক্ষণিক খরচ মেটাতে ব্যাংক থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হতে পারে, যা জনগণের ওপর বাড়তি ঋণের বোঝা চাপবে বলেও মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

বিষয়টি নিয়ে ভ্যাটের মাঠ পর্যায়ে কাজ করা ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে কালবেলা। তারা কালবেলাকে জানিয়েছেন, নতুন নিয়মে বাইরে থেকে সহজীকরণ বলে ঢাকঢোল পেটানো হচ্ছে। বিষয়টি আসলে সহজ না। নতুন নিয়মে সরকারি কোষাগারে অর্থ জমা হওয়ার বিষয়টি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।