আমি আর আমার মা বাসের মধ্যে পাশাপাশি বসে ছিলাম। হঠাৎ বাস নদীতে পড়ে গেলে মা আমাকে ধাক্কা দিয়ে জানালা দিয়ে বের করে দেয়। কিন্তু মানুষের চাপে মা আর বের হতে পারেনি। আমি পানিতে ভাসছিলাম, পরে একজন গামছা দিয়ে টেনে আমাকে ওপরে তোলে। এরপর আর মাকে দেখিনি।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই দৌলতদিয়া ঘাটে বাসডুবির সেই ভয়াবহ মুহূর্তের বর্ণনা দিচ্ছিল ১০ বছর বয়সী শিশু আলিফ মোল্লা।
গত ২৫ মার্চ দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে ‘সৌহার্দ্য পরিবহনের’ একটি বাস পদ্মা নদীতে তলিয়ে গেলে প্রাণ হারান আলিফের মা জ্যোৎস্না বেগম।
নিহত জ্যোৎস্না বেগম রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের বড় চর বেনিনগর গ্রামের মান্নান মণ্ডলের মেয়ে। প্রায় পাঁচ বছর আগে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর একমাত্র সন্তান আলিফকে নিয়েই ছিল তার পৃথিবী। ঢাকার বাইপাইলে একটি পোশাক কারখানায় কাজ করে সংসার চালাতেন তিনি। মা-ছেলের সেই সাজানো সংসার এখন তছনছ।
সরেজমিনে নিহতের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় শোকের মাতম। আলিফের নানি শাহেদা বেগম মেয়ের শোকে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন।
বিলাপ করতে করতে তিনি বলেন, ১৯ মার্চ ঈদের ছুটিতে মেয়ে আর নাতি বাড়িতে এসেছিল। ২৫ মার্চ আমি নিজে তাদের বাসে তুলে দিই। ঘাটে পৌঁছে মেয়ে ফোন দিয়ে বলেছিল— ‘মা, আমরা এখন ঘাটে।’ কথা বলতে বলতেই হঠাৎ চিৎকার করে উঠল, বলল— ‘আম্মা, বাস পদ্মায় পড়ে যাচ্ছে!’ এরপর আর কোনো কথা শুনতে পাইনি। আমার মেয়েটা ফোনে কথা বলতে বলতেই নদীর তলে চলে গেল।
আলিফের পরিবার জানায়, বাসটি যখন ডুবছিল, তখন নিজের জীবনের পরোয়া না করে একমাত্র সন্তানকে বাঁচাতে জানালার সরু পথ দিয়ে ধাক্কা দিয়ে বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন জ্যোৎস্না। আলিফ বেঁচে ফিরলেও অভাগী মা আর ফিরতে পারেননি।
আলিফের মামি মিতা বেগম বলেন, আলিফ বেঁচে ফিরেছে ঠিকই, কিন্তু ওর আপন বলতে আর কেউ রইল না। আমরা মামা-মামিরা আছি, কিন্তু মায়ের জায়গা কি আর কেউ নিতে পারে?
পুরো এলাকায় এখন শোকের ছায়া। একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা কেড়ে নিল এক সংগ্রামী মায়ের প্রাণ, আর এক শিশুকে ঠেলে দিল অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ লুৎফর রহমান হীরা
হেড অফিসঃ ১/ জি,আদর্শ ছায়ানীড়, রিংরোড, শ্যামলী, আদাবর ঢাকা - ১২০৭।
স্বত্ব © ২০২৫ চলনবিলের সময়