বিভাগীয় শহর রংপুরে আদিবাসী ভাষা অধিকারবিষয়ক একক বক্তৃতা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি, শনিবার সকালে বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তার প্ল্যাটফর্ম ‘আত্মসভা’ শহরের কলেজ রোডে অবস্থিত ‘গড়ন আর্ট গ্যালারি অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারে’ এ আয়োজন করে। ‘জাতিতাত্ত্বিক ভাষা : আদিবাসী অধিকার ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্ ‘ শীর্ষক একক এই বক্তৃতা অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদান করেন গারো কবি ও গবেষক হিমেল রিছিল। তিনি তার বক্তৃতায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সাংস্কৃতিক সংকট, সংকট উত্তরণ এবং আদিবাসী ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্যের সম্ভাবনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নিজ ভাষা ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে হলে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এআইসহ প্রযুক্তির সকল মাধ্যমে আদিবাসী ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির কন্টেট তৈরি করতে হবে এবং ভাষা-সাহিত্যকে ছড়িয়ে দিতে হবে।
নিজেদের ভাষার সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণের তাগিদ জানিয়ে তিনি আরও বলেন, জাতিতাত্ত্বিক ভাষা ও সংস্কৃতিকে বাঁচাতে নিজ নিজ জাতিসত্তাকেই আগে এগিয়ে আসতে হবে। ব্যক্তি বা সামাজিক পর্যায় থেকেই উদ্যোগগুলো গ্রহণ করা প্রয়োজন। নিজেদের ভাষায় সাহিত্য ও সংগীত রচনা করতে হবে এবং নিজেরা নিজেদের মধ্যে নিজ ভাষায় কথা বলা অব্যহত রাখতে হবে। বক্তৃতা অনুষ্ঠানে উপস্থিত শ্রোতা, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর রংপুরের সভাপতি খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু আদিবাসী ভাষা রক্ষায় রাষ্ট্রিয় পৃষ্ঠপোষকতার আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে আগত শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম হক্কানী বলেন, আদিবাসীদের নিজ ভাষায় শিক্ষার সুযোগ তৈরি করতে হবে। সমতল থেকে পাহাড়, আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় তাদের ভাষাভাষীদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করাও প্রয়োজন। তাদের ভাষায় রচিত পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নও সময়ের দাবি। অন্যথায় তাদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করা সম্ভব হবে না।
কবি ও প্রাবন্ধিক আব্দুর রাজ্জাক তার অভিমত প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, আদাবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে খুব কম কথা হয়। এমন সময় এই আয়োজন নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। একই সঙ্গে আদিবাসী জাতিসত্তা রক্ষায় তাদের তাড়িত করবে।
আদিবাসী নেতা সমুন খালকো জানান, আদিবাসীদের ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে রংপুরে এটাই প্রথম কোনো অনুষ্ঠান। এই আয়োজন উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জাতিসত্তার তরুণদের নতুন করে লড়াই সংগ্রামের চেতনাকে উদ্বুদ্ধ করছে।
অন্যান্যদের মধ্যে আরও অভিমত প্রকাশ করেন, অধিকারকর্মী অশোক সরকার, আলোকচিত্রী ফিরোজ চৌধুরী, শিল্পী অনীক রেজা, খাইশ্যা অং মরমা, রিনা মুর্মুসহ প্রমূখ।
অনুষ্ঠান আয়োজক কবি ও চিন্তক মীর রবি বলেন, ভাষা একটি সমাজের সামগ্রিক সংস্কৃতির প্রধান ধারক, বাহক ও ভিত্তি। জাতিতাত্ত্বিক পরিচয়ের মৌলিক উপাদানও ‘ভাষা’। সমাজ-সংস্কৃতির উদ্ভব ও বিকাশের সঙ্গেও এর সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। এ থেকে বিচ্যুত হলে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ে। আর ভাষার মৃত্যু হলে সেই জাতিরও পরিসমাপ্তি ঘটে। এই সংকট উত্তরণে আদিবাসীদের জাতিসত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার তাগিদ থেকেই আমাদের এই আয়োজন।
আত্মসভা পর্ষদের অন্যতম সদস্য, কবি আহমেদ মওদুদ বলেন, ‘আত্মসভা’ বিশ্বাস করে আদিবাসীদের ভাষাগত অধিকার নিশ্চিত না করা হলে বায়ান্নের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে না। সেই আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশায় এই আয়োজন রাষ্ট্র ও তার নীতি-নির্ধারকগণের বোধোদয় ঘটালে আমরা সার্থক হবো।
কবি কাইয়ূম খান জানান, বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তার বিকাশের লক্ষ্যেই 'আত্মসভা'র যাত্রা শুরু হয়েছে। চিন্তা ও চিন্তার চর্চাগত তৎপরতা অব্যাহত রাখতে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং ভাষা ও সাহিত্য কেন্দ্রিক বক্তৃতা, সেমিনার, আলোচনা সভা, বৈঠক, শিল্প প্রদর্শনীসহ বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে এই প্ল্যাটফর্ম। আদিবাসী ভাষা অধিকারবিষয়ক এই একক বক্তৃতা অনুষ্ঠানে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, কারমাইকেল কলেজ এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যায়নরত আদিবাসী শিক্ষার্থীসহ স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গ, অধিকারকর্মী, লেখক, সাংবাদিক ও শিক্ষকসহ নানা শ্রেণিপেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। শিল্পী ইসরাত জাহান কাকন ও শ্যামলী হোসদা আদিবাসী সংগীত পরিবেশন করেন। নিওন চাকমরা গিটারের সুরের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হয়।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ লুৎফর রহমান হীরা
হেড অফিসঃ ১/ জি,আদর্শ ছায়ানীড়, রিংরোড, শ্যামলী, আদাবর ঢাকা - ১২০৭।
স্বত্ব © ২০২৫ চলনবিলের সময়