শিশু আইসিইউতে কাজ করছে না অ্যান্টিবায়োটিক, গবেষণায় উদ্বেগ

: রাজশাহী প্রতিনিধি
প্রকাশ: 2 days ago

9

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (রামেক) শিশু নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটে (পিআইসিইউ) ভর্তি গুরুতর অসুস্থ শিশুদের শরীরে পাওয়া অধিকাংশ জীবাণুই প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলেছে।

হাসপাতালটির এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, শনাক্ত হওয়া প্রতি ১০টি জীবাণুর মধ্যে প্রায় ৯টিই ওষুধপ্রতিরোধী (মাল্টিড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট-এমডিআর), যা শিশুদের চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে।

গত ১ জুন প্রকাশিত জার্নাল অব টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন-এ প্রকাশিত গবেষণায় ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে পিআইসিইউতে ভর্তি এক মাস থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা ৪৯টি জীবাণুর নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, মোট নমুনার ৬১ দশমিক ২ শতাংশ ছিল গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া এবং এর মধ্যে ৯০ শতাংশই বহু ওষুধপ্রতিরোধী। সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হওয়া জীবাণু ছিল অ্যাসিনেটোব্যাক্টার বাউমানি গোষ্ঠী, যা মোট নমুনার ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়া , যার হার ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব জীবাণুর বিরুদ্ধে বহুল ব্যবহৃত শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিকও কার্যকারিতা হারাচ্ছে। গবেষণায় ইমিপেনেমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের হার ৯৬ দশমিক ৭ শতাংশ, মেরোপেনেম ও পাইপারাসিলিন-টাজোব্যাক্টামের বিরুদ্ধে ৯৬ দশমিক ৪ শতাংশ, সিপ্রোফ্লক্সাসিনের বিরুদ্ধে ৯০ শতাংশ, জেন্টামাইসিনের বিরুদ্ধে ৮৯ দশমিক ৩ শতাংশ এবং অ্যামিকাসিনের বিরুদ্ধে ৮৭ দশমিক ৫ শতাংশ প্রতিরোধ লক্ষ্য করা হয়েছে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে সংগৃহীত সব গ্রাম-নেগেটিভ জীবাণুই পরীক্ষায় ব্যবহৃত ছয়টি প্রচলিত প্রথম সারির অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী ছিল। অর্থাৎ, এসব সংক্রমণের ক্ষেত্রে প্রচলিত চিকিৎসা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ছে।

তবে পরীক্ষাধীন ওষুধগুলোর মধ্যে টাইগেসাইক্লিন এবং কোলিস্টিন তুলনামূলকভাবে কার্যকর রয়েছে। গবেষকরা বলছেন, বর্তমানে জটিল সংক্রমণ মোকাবিলায় এই দুটি ওষুধই অনেক ক্ষেত্রে শেষ ভরসা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

গবেষণায় গ্রাম-পজিটিভ ব্যাকটেরিয়ার মধ্যেও প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষণ পাওয়া গেছে। যদিও সব গ্রাম-পজিটিভ নমুনা লাইনেজোলিড, ড্যাপটোমাইসিন ও টাইগেসাইক্লিনের প্রতি সংবেদনশীল ছিল, তবুও টেইকোপ্লানিনের বিরুদ্ধে ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ নমুনায় প্রতিরোধ শনাক্ত হয়েছে।

গবেষকরা ওষুধপ্রতিরোধী সংক্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণও চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে পূর্বে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ইতিহাস সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাভাসকারী হিসেবে উঠে এসেছে। এ ছাড়া দীর্ঘ সময় আইসিইউতে অবস্থান, ৪৮ ঘণ্টার বেশি সময় ভেন্টিলেশন সাপোর্টে থাকা এবং কেন্দ্রীয় শিরা ক্যাথেটার ব্যবহারের কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, ওষুধপ্রতিরোধী জীবাণুতে আক্রান্ত শিশুদের সুস্থ হতে তুলনামূলকভাবে বেশি সময় লাগে, ফলে চিকিৎসার ব্যয় ও জটিলতাও বৃদ্ধি পায়।

গবেষণার প্রধান লেখক এবং রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটের ইনচার্জ ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, গবেষণার ফলাফল স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ওপর আরও কঠোর নজরদারি এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি। হাসপাতাল ও কমিউনিটি পর্যায়ে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার জীবাণুর প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং বিদ্যমান চিকিৎসা পদ্ধতির কার্যকারিতা কমিয়ে দিচ্ছে।

গবেষণায় অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল স্টুয়ার্ডশিপ বা দায়িত্বশীল অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি জোরদার করা, হাসপাতালগুলোতে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা এবং নিয়মিত জীবাণুর প্রতিরোধের ধরন পর্যবেক্ষণের সুপারিশ করা হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে ভবিষ্যতে সাধারণ সংক্রমণের চিকিৎসাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তাই শিশুদের জীবন রক্ষায় এখনই সমন্বিত উদ্যোগ, যৌক্তিক অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার এবং হাসপাতাল ভিত্তিক সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি বলে মনে করেন।