সবুজের আড়ালে ধূসর জীবন

: সিলেট জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশ: 23 hours ago

34

সবুজ চা বাগান যতটা চোখ জুড়িয়ে দেয়, তার আড়ালে থাকা শ্রমিকদের জীবন ততটাই কঠিন ও বঞ্চনার। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে টিলার পর টিলা চা পাতা তোলাই যাদের নিত্যদিনের কাজ, সেই চা শ্রমিকদের জীবনে নেই কোনো স্বস্তি।

আজ পহেলা মে, আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। বিশ্বজুড়ে যখন শ্রমের মর্যাদা উদযাপিত হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের চা শ্রমিকরা এখনও ন্যূনতম মজুরি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবিক মর্যাদার দাবিতেই কণ্ঠ তুলছেন।

বাগানে কাজ করা শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বংশপরম্পরায় তারা এই বাগানে কাজ করে আসছেন। কিন্তু হাড়ভাঙা খাটুনির বিনিময়ে বর্তমান বাজারে তারা যে মজুরি পান, তা দিয়ে কোনোভাবেই একটি পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে যৎসামান্য মজুরিতে দুবেলা আহার জোগাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।

শুধু মজুরি নয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং উন্নত আবাসন সুবিধার ক্ষেত্রেও চা শ্রমিকরা এখনো অনেক পিছিয়ে। অধিকাংশ বাগানে ভাঙাচোরা খুপরি ঘরে গাদাগাদি করে বসবাস করতে হয় তাদের। উন্নত চিকিৎসা সেবার অভাব এবং সন্তানদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ না থাকায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম তারা এই বাগানকেন্দ্রিক ‘চা শ্রমিক’ পরিচয় থেকেই বের হতে পারছে না।

সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত রোদে পুড়ে পাতা তোলাই তাদের নিয়তি। বৃষ্টির দিনে কর্দমাক্ত টিলায় কাজ করতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা উৎপাদন সচল রাখলেও, দিনশেষে তাদের ভাগ্যে জোটে কেবল অবহেলা।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার পাত্রখোলা চা বাগানের চা শ্রমিক লাবনী গড় ও হীরা গোয়ালা আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাদের জীবনটা এই চা গাছগুলোর মতোই। সারাজীবন অন্যকে চা খাইয়ে চাঙ্গা করি, কিন্তু আমাদের নিজেদের জীবনটা সারাজীবন তেতোই থেকে যায়।’

আলীনগর চা বাগানের নারী শ্রমিক লক্ষ্মী কৈরী ও সুনীতা রবিদাস বলেন, ‘আমাদের একটাই চাওয়া, আমরা কেবল পর্যটকদের ক্যামেরার ফ্রেমবন্দি সুখী শ্রমিক হয়ে থাকতে চাই না। আমরা ন্যূনতম মজুরি ও মানবিক মর্যাদার সঙ্গে জীবন কাটাতে চাই। আমরা সন্তানদের শিক্ষা, শ্রমিকদের চিকিৎসা এবং উন্নত আবাসন সুবিধা চাই।’

পাত্রখোলা চা বাগানের শ্রমিক নেতা মহাদেব মাদ্রাজি বলেন, ‘চা শ্রমিকদের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে এ দেশে এনে স্বল্প মজুরির মাধ্যমে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করানো হচ্ছে। এখনও তারা অধিকারবঞ্চিত।’

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক উপদেষ্টা রামভজন কৈরী বলেন, ‘চা শ্রমিকদের মৌলিক চাহিদা পূরণে দীর্ঘদিন ধরে মজুরি বৃদ্ধি, ভূমি অধিকার, বাসস্থান ও চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নসহ বিভিন্ন দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু এসব বাস্তবায়ন না হওয়ায় তাদের মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে। অবহেলিত চা শ্রমিকদের বাসস্থানের জায়গাটুকু তাদের নিজের নামে দিতে হবে। যদি সেটা করা হয়, তাহলে আমরা দাসত্ব থেকে মুক্তি পাব।’

চা বোর্ডের তথ্যমতে, দেশে সমতল ও পাহাড় মিলে চা বাগানের সংখ্যা ১৬৭টি। এর মধ্যে মৌলভীবাজার জেলাতেই রয়েছে ৯২টি বাগান। ৮৫ হাজার ৫৪১ দশমিক ৬২ একর জমিতে চা চাষ হচ্ছে এবং দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ৭৫ শতাংশ আসে এই অঞ্চল থেকে।

অথচ দেড় লাখ শ্রমিকের জীবনযাত্রার মান ক্রমশ কমছে। ২০১৫ সালে মজুরি ছিল ৮৫ টাকা, যা ২০২২ সালের আন্দোলনের পর ১৭০ টাকা করা হয়। বর্তমানে বার্ষিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধিতে শ্রমিকরা দৈনিক ১৭৮ টাকা ৫০ পয়সা পাচ্ছেন। আগামী আগস্টে আরও ৫ শতাংশ বৃদ্ধির কথা থাকলেও বর্তমান বাজার বাস্তবতায় এই মজুরি অত্যন্ত নগণ্য।