সিজদার সময় পুরুষদের পা কীভাবে থাকবে? জানুন সঠিক নিয়ম

: চলনবিলের সময় ডেস্ক
প্রকাশ: 2 hours ago

9

নামাজ মানুষকে দুনিয়ার অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। আলোর পথে প্রভাবিত করে। ইসলামে প্রাপ্ত বয়স্ক প্রত্যেক মুসলমানের ওপর এই নামাজকে ফরজ করা হয়েছে।

ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমরা আমার স্মরণোদ্দেশ্যে নামাজ কায়েম করো’ (সুরা ত্বহা : ১৪)। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তুমি সূর্য হেলার সময় থেকে রাতের অন্ধকার পর্যন্ত নামাজ কায়েম কর এবং ফজরের নামাজ (কায়েম কর)। নিশ্চয়ই ফজরের নামাজে সমাবেশ ঘটে।’ (সুরা বনি ইসরাঈল : ৭৮)

রাব্বুল আলামিন আরও বলছেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে’ (সুরা আনকাবুত : ৪৫)

নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে এর ভেতরে-বাইরে অনেকগুলো ফরজ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো সিজদা। আর সিজদা আদায়ের সময় অনেকে ধন্দে পড়েন যে, পায়ের গোড়ালি পৃথক রাখবেন নাকি মিলিয়ে রাখবেন। চলুন তাহলে জেনে নিই বিস্তারিত—

ইসলামি গবেষণা পত্রিকা মাসিক আল কাউসারে বলা হয়েছে, সিজদার সময় পুরুষদের উভয় পায়ের গোড়ালি পৃথক রাখাই সুন্নাহসম্মত ও সঠিক নিয়ম। হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিজদার সময় উভয় পা পৃথক রাখতেন এবং পায়ের আঙুলগুলো কিবলামুখী করে রাখতেন।

বারা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন রুকুতে যেতেন, পিঠ বিছিয়ে দিতেন। যখন সিজদায় যেতেন, আঙুলগুলো কিবলামুখী করে উভয় পা পৃথক করে রাখতেন। (সুনানে কুবরা, বায়হাকী: ২/১১৩)

আল্লামা ইবনে হাজার (রাহ.) এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, এখানে বর্ণিত فتَفاجَّ শব্দের অর্থ হলো, তিনি তার উভয় পায়ের মাঝে ফাঁকা রাখতেন। (আততালখীসুল হাবীর: ২/৬১৮)

হানাফি মাজহাব ও অন্যান্য মাজহাবের ফকিহগণও সিজদার সময় উভয় পা পৃথক রাখার কথা বলেছেন।

ইমাম তাহাবি (রাহ.) বলেন, আমরা দেখি যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত হচ্ছে রুকু এবং সিজদায় (অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মাঝে) দূরত্ব রাখা। এ বিষয়ে সবার ঐকমত্যও রয়েছে। অতএব এর দ্বারা নামাজে অঙ্গসমূহকে পৃথক রাখার বিষয় সাব্যস্ত হয়। (শরহু মাআনিল আছার: ১/১৬৬)

ইমদাদুল আহকামে ইমাম তাহাবি (রহ.)-এর এ বক্তব্য উল্লেখ করার পর বলা হয়েছে, ইমাম তাহাবির কথা থেকে বোঝা যায় যে, পুরুষের জন্য রুকু কিংবা সিজদায় অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো পরস্পর মিলিয়ে রাখা নিয়মসম্মত নয়; বরং নিয়মসম্মত পদ্ধতি হচ্ছে এর বিপরীত। অর্থাৎ উভয় অঙ্গের মাঝে দূরত্ব রাখা। (ইমদাদুল আহকাম: ১/৪৭৮)

ইমাম শাফেয়ি (রাহ.) বলেন, অর্থাৎ আমার নিকট পছন্দনীয় হল, সিজদাকারী তার বুক ঊরু থেকে উঠিয়ে আলাদা রাখবে। উভয় কনুই ও বাহু পার্শ্বদেশ থেকে দূরে রাখবে। এক হাঁটু আরেক হাঁটুর সাথে মিলিয়ে রাখবে না এবং উভয় পা পৃথক রাখবে। (কিতাবুল উম্ম: ১/১৩৭)

ইবনে কুদামা (রাহ.) বলেন, অর্থাৎ (সিজদাকারীর জন্য) উভয় হাঁটু এবং উভয় পায়ের মাঝে ফাঁকা রাখা মুস্তাহাব। (আলমুগনী: ২/২০২)

উল্লেখ্য, এক্ষেত্রে একটি বর্ণনায় উভয় গোড়ালি মিলিয়ে রাখার কথাও এসেছে। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিছানায় পেলাম না, অথচ তিনি আমার সঙ্গেই বিছানায় ছিলেন। (তখন আমি তাকে তালাশ করলাম) এরপর তাকে পেলাম সিজদারত অবস্থায়, তিনি উভয় গোড়ালি মিলিয়ে রেখেছেন এবং আঙুলসমূহের অগ্রভাগ কিবলামুখী করে রেখেছেন। (সহিহ ইবনে খুযায়মা: ৬৫৪)

তবে এ হাদিসটি অন্য আরও সহিহসূত্রে বর্ণিত হয়েছে। সেই বর্ণনাগুলোতে رَاصًّا عَقِبَيْهِ (উভয় গোড়ালি মিলিয়ে রেখেছেন) এ অংশটুকু নেই। (দ্রষ্টব্য : সহিহ মুসলিম: ৪৮৬, সুনানে আবু দাউদ: ৮৭৫, সহিহ ইবনে খুযায়মা: ৬৫৫)

হাকেম (রাহ.) এ হাদিস উল্লেখ করে বলেন, এই বর্ণনা ছাড়া অন্য কোথাও সিজদার সময় উভয় গোড়ালি মিলিয়ে রাখার কথা কেউ উল্লেখ করেছেন বলে আমার জানা নেই। (মুস্তাদরাকে হাকেম: ৯২৮)

হাকেম (রাহ.) হয়তো এ কথা দ্বারা এই হাদিসের উক্ত বর্ণনায় উভয় গোড়ালি মিলিয়ে রাখার অতিরিক্ত এ অংশটি শায (তথা বিচ্ছিন্ন) হওয়ার দিকে ইঙ্গিত করেছেন।

তাছাড়া পায়ের গোড়ালি উভয়টি পুরোপুরি মিলিয়ে রাখলে সিজদার সময় পায়ের সকল আঙুল কিবলামুখী করে রাখা সম্ভব হয় না। অথচ একাধিক সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিজদায় উভয় পায়ের আঙুল কিবলামুখী করে রাখতেন। (দ্রষ্টব্য : সহিহ বোখারি: ৮২৮, সুনানে আবু দাউদ: ৭৩২)

সেসব হাদিসের ভিত্তিতেও পায়ের গোড়ালি মিলিয়ে রাখার এই বর্ণনা অনুযায়ী আমল করা কঠিন। অতএব এক্ষেত্রে এটিই নির্ভরযোগ্য বক্তব্য যে, সিজদায় উভয় পায়ের গোড়ালি পৃথক রেখে পায়ের আঙুলগুলো কিবলামুখী করে রাখবে। (আলমাজমূ, নববী: ৩/৪০৭, আসসিআয়া: ২/১৮০-১৮১, বাকিয়াতে ফাতাওয়া রশীদিয়া: ১৭১)