
প্রায় ৩০ ফুট উঁচু চড়ক গাছে পিঠে বরশি গেঁথে ঝুলছেন দুই যুবক, চারদিকে উলুধ্বনি, শঙ্খধ্বনি আর ঢাকের তালে তালে মুখরিত পরিবেশে সিলেটের লাক্কাতুরা চা বাগানে নেমেছে মানুষের ঢল। চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখকে ঘিরে আয়োজিত ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী চড়ক পূজায় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি উৎসবের আমেজে মেতে ওঠেন হাজারো মানুষ।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) অনুষ্ঠিত এ পূজায় হিন্দু সম্প্রদায়ের হাজারো মানুষের পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মাবলম্বী দর্শনার্থীদেরও ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী প্রতি বছর চৈত্র সংক্রান্তিতে অনুষ্ঠিত হয় এ চড়ক পূজা। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। লাক্কাতুরা সেভরন কোম্পানির পাশের মাঠে সকাল থেকেই বসে মেলা, আর বিকেলে শুরু হয় পূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা। চা বাগানের টিলাবেষ্টিত সমতল ভূমিতে স্থাপন করা হয় চড়ক গাছ, যা ঘিরেই চলে সব আয়োজন। বিকেলে পূজার প্রধান আকর্ষণ হিসেবে দুইজন সন্ন্যাসীর পিঠে লোহার বড়শি গেঁথে চড়ক ঘোরানো হয়। এ সময় ভক্তরা বাতাসা, নকুলদানা ও কলা ছুড়ে দেন, যা কুড়িয়ে নিতে ভিড় করেন দর্শনার্থীরা। চারদিকে ধ্বনিত হয় জয়ধ্বনি ও নারীদের উলুধ্বনি, যা পুরো পরিবেশকে করে তোলে আরও উৎসবমুখর।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ঐতিহ্যের চড়ক পূজা দেখতে মঙ্গলবার দুপুরের পর থেকে দর্শনার্থীরা ভিড় জমান লাক্কাতুরা সেভরন কোম্পানির পাশের মাঠে। বিকেল গড়ানোর আগে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় এ মাঠ। এ সময় মাঠের চারপাশের টিলায়ও অবস্থান করেন দর্শনার্থীরা। সিলেটের বিভিন্ন স্থান থেকে হাজার হাজার হিন্দু ধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষ সমাগম ঘটে এ পূজা দেখতে।
পূজার বিভিন্ন ধাপে পরিবেশিত বিভিন্ন আচার। দুজন কালী, একজন শিব ও একজন পার্বতীর সাজে অংশগ্রহণকারীরা তাণ্ডব নৃত্য পরিবেশন করেন। এরপর জ্বলন্ত আগুনের মধ্যে ‘কালীনাচ’ এবং তান্ত্রিক মন্ত্র দিয়ে সাতটি বলিছেদ (লম্বা দা) এর ওপর শিব শয্যা করেন সন্ন্যাসীরা। শিবের ওপর উঠে কালী ভয়ানক এক অদ্ভুত রূপ ধারণ করেন। এ সময় উপস্থিত দর্শনার্থী সবাই আতঙ্কিত হয়ে উঠেন। বড়শি গাঁথা আগে সন্ন্যাসীদের জিহ্বা ও গলায় গেঁথে লোহার শিকল গেঁথে দেওয়া হয়। চড়ক পূজার শেষপর্বে দুই যুবকের পিঠে বরশি গেঁথে চড়ক গাছে ঝুলিয়ে ঘোরানো হয়, যা দেখতে হাজারো মানুষ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। এ দৃশ্যকে কেন্দ্র করে বিকেলের আগেই পূজাস্থল কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। স্থান সংকুলান না হওয়ায় আশপাশের টিলাগুলোতেও অবস্থান নেন দর্শনার্থীরা।
চড়ক পূজা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের একটি প্রাচীন লোকোৎসব, যার ইতিহাস হাজার বছরের পুরনো বলে মনে করা হয়। চৈত্র মাসের শেষ থেকে বৈশাখের শুরু পর্যন্ত মহাদেব শিবের আরাধনায় নানা পূজা-অর্চনার পর আয়োজন করা হয় এই চড়ক পূজার। সিলেট শহর ও আশপাশের এলাকা থেকে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ অংশ নেন।
পূজা দেখতে আসা নগরীর আখালিয়ায় দূর্জয় সেন কালবেলাকে বলেন, মহাদেবের পূণ্য লাভের আশায় প্রতি বছর পরিবার নিয়ে এখানে আসি। বছরে একবার হয় তাই কষ্ট হলেও আসতে হয় আমাদের।
নগরীর পাঠানঠুলা এলাকার প্রিয়া রায় কালবেলাকে বলেন, চড়ক পূজা ছোট থেকে শুনেছি কিন্তু আমার আগে দেখা হয়নি। এবার এসে দেখলাম এটি সত্যিই দুঃসাহসিক ও ঐতিহ্যবাহী একটি আয়োজন।
এদিকে, পূজাকে কেন্দ্র করে মাঠের চারপাশ ও সংলগ্ন এলাকায় বসে গ্রামীণ মেলা। খেলনা, মাটির সামগ্রী, মিষ্টান্নসহ বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন ব্যবসায়ীরা। মেলায় ক্রেতাদেরও ছিল উপচেপড়া ভিড়।