স্কুল ফিডিংয়ে ‘নষ্ট খাবার’ দিল ঠিকাদার, শোকজ খেলেন প্রধান শিক্ষক!

: মেহেরপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: 2 hours ago

26

মেহেরপুরের গাংনীতে শিক্ষার্থীদের মাঝে পচা ডিম ও ছত্রাকযুক্ত পাউরুটি বিতরণের ঘটনায় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

জানা গেছে, শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং ঝরে পড়া রোধের লক্ষ্যে চলতি বছরের ২৯ মার্চ থেকে গাংনী উপজেলার ১৬২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৮ হাজার ৩৪৭ জন শিক্ষার্থীর জন্য ‘স্কুল ফিডিং’ কর্মসূচি চালু করা হয়। কর্মসূচির আওতায় পর্যায়ক্রমে পাউরুটি, কলা, ডিম, দুধ ও বিস্কুট সরবরাহ করা হচ্ছে। এসব খাদ্য সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে সাতক্ষীরাভিত্তিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘সুশীলন’ এনজিও।

১ জুলাই গাংনী পৌর শহরের বাঁশবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় শিক্ষার্থীদের মাঝে পচা ডিম ও ছত্রাকযুক্ত পাউরুটি বিতরণের অভিযোগ উঠে। বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে শিক্ষা প্রশাসনের মধ্যে নড়াচড়া শুরু হয়।

তবে অভিযোগ উঠেছে, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উপজেলা শিক্ষা প্রশাসন বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাজহারুল ইসলামকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রশিদের সঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সখ্যতার কারণে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যদিও এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

শুরু থেকেই উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে নিম্নমানের ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্য সরবরাহের অভিযোগ ছিল বলে জানা গেছে। সর্বশেষ বাঁশবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরবরাহ করা ডিম পচা এবং পাউরুটিতে ছত্রাক পাওয়ার অভিযোগ প্রকাশ্যে এলে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা খাদ্যের মান নিয়ে আপত্তি জানিয়ে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছিলেন বলেও জানা গেছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, সে সময় কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

অভিভাবক আব্দুর রহিম বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাজহারুল ইসলামকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। এতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নানা অনিয়ম করতে উৎসাহিত হবে।

তিনি আরও বলেন, শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকির জন্য দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে কেন একজন শিক্ষককে জবাবদিহির মুখোমুখি করা হচ্ছে, সেটি প্রশ্নের বিষয়।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, শিশুদের জন্য পরিচালিত স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে নিম্নমানের বা নষ্ট খাদ্য সরবরাহ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তারা মনে করেন, সরবরাহ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে তদারকি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত খাদ্য নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের মাসোহারা না দিলে বিল নিয়ে নানা জটিলতায় পড়তে হয়। তাদের খুশি রাখতে যা করার প্রয়োজন, তা করতে হয়।

তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাজহারুল ইসলাম বলেন, চোর ধরাই আমার বড় অপরাধ হয়েছে। তাই শোকজ খেয়েছি।

এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রশিদ বলেন, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে শোকজ করা হয়েছে।

তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে কেন প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি স্পষ্ট কোনো মন্তব্য করেননি।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সুকুমার মৈত্র বলেন, ঘটনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে প্রধান শিক্ষককে শোকজ করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি সমাধান করে দেওয়া হবে।