১২০ টাকায় পুলিশের চাকরি ‘বাবাকে দিতে পারলাম না চাকরি পাওয়ার খবর’ বদলে গেল ৪৯ তরুণ-তরুণীর ভাগ্য

: রাজশাহী প্রতিনিধি
প্রকাশ: 3 hours ago

5

আমার বাবাকে দেখাতে পারলাম না, যে আমি চাকরি পাইছি।’ কথাটি বলেই থেমে যান ইসরাফিল মুসা। চোখে পানি, কণ্ঠে কান্না। পাঁচ বছর আগে বাবাকে হারানো এই তরুণের মুখে তখন আনন্দ আর বেদনার মিশ্র অনুভূতি। রাজশাহীর পবা উপজেলার কর্ণহার থানার দারুশা বাজার এলাকার বাসিন্দা মুসা এবার বাংলাদেশ পুলিশের ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল (টিআরসি) পদে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনের মুহূর্তে পাশে নেই বাবা।

২০২১ সালে বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে মুসা ও তার মা চম্পা বেগমের কাঁধে। মুসা মাসে সাড়ে ৪ হাজার টাকায় দারুসা বাজারের একটি ফলের দোকানে কাজ করতেন। তার মা প্রাণ এগ্রোর গার্মেন্টস সেকশনে কাজ করে আয় করতেন সাড়ে ৮ হাজার টাকা। এদিকে নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছোট বোন সংসারের রান্নাবান্না সামলে স্কুলে যেত।

দিনভর কাজের পর মাত্র দুই ঘণ্টা সময় বের করে পড়াশোনা করতেন মুসা। সেই পরিশ্রমই আজ তাকে পুলিশের চাকরিতে পৌঁছে দিয়েছে। কিন্তু আফসোস একটাই— বাবা আর সেই সাফল্য দেখে যেতে পারলেন না।

শুধু মুসা নন, এবারের নিয়োগে নির্বাচিতদের অধিকাংশের জীবনই সংগ্রামের গল্পে ভরা। কারও বাবা কৃষক, কারও চা-দোকানি, কেউ দিনমজুর, কেউ কাঠমিস্ত্রি, আবার কেউ এতিম হয়েও নিজের যোগ্যতায় জায়গা করে নিয়েছেন পুলিশ বাহিনীতে।

শনিবার (২৭ জুন) রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে এসব পরিবারের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে স্বপ্ন, সংগ্রাম আর সফলতার এমনই অসংখ্য গল্প।

রাজশাহীর কাকনহাট এলাকার ছাদনীপাড়া গ্রামের কৃষক সুকুমারের মেয়ে শিখা লাকড়া। ছোটবেলা থেকেই পুলিশের পোশাক পরার স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু পরপর দুইবার ব্যর্থ হওয়ার পর হাল ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন।

শিখা কালবেলাকে বলেন, আমি বাবাকে বলেছিলাম, আর আবেদন করব না। বাবা বলেছিলেন, শেষবার আরেকবার চেষ্টা কর। সেই চেষ্টাতেই চাকরি হয়ে গেল। এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না।

তার বাবা সুকুমার চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, আমার জীবনে এর চেয়ে বড় আনন্দ আর নেই।

মোহনপুর বাজারের চা-দোকানি শাহাদাত হোসেন দুলালের ছেলে পারভেজ জাহান শান্তও এবার কনস্টেবল পদে নিয়োগ পেয়েছেন।

দুলাল কালবেলাকে বলেন, সবাই বলেছে পুলিশের চাকরি পেতে অনেক টাকা লাগে। কিন্তু আমার ছেলে কোনো টাকা ছাড়াই চাকরি পেয়েছে। এখনও বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।

পারভেজ কালবেলাকে বলেন, মানুষকে বোঝানো কঠিন যে টাকা ছাড়া পুলিশের চাকরি হয়। কিন্তু আমি তার জীবন্ত প্রমাণ।

এবারের নিয়োগের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়—একজন প্রার্থীর পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারি নির্ধারিত ফি বাবদ খরচ হয়েছে মাত্র ১২০ টাকা। কোনো সুপারিশ, তদবির কিংবা আর্থিক লেনদেন ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে পুরো প্রক্রিয়া বলে জানিয়েছে জেলা পুলিশ।

রাজশাহী জেলা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, এবার ৩ হাজার ৭৪৮ জন আবেদন করেন। পরীক্ষায় অংশ নেন ২ হাজার ৬৮৩ জন। বিভিন্ন ধাপ শেষে ৮৮০ জন লিখিত পরীক্ষায় এবং ১০২ জন মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেন। সবশেষে শারীরিক সক্ষমতা, লিখিত, মনস্তাত্ত্বিক ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বরের ভিত্তিতে চূড়ান্তভাবে ৪৯ জনকে নির্বাচিত করা হয়। এর মধ্যে ৪৬ জন পুরুষ ও তিনজন নারী। অপেক্ষমাণ তালিকায় রাখা হয়েছে পাঁচজনকে।

রাজশাহীর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাঈমুল হাছান কালবেলাকে জানান, আমরা শুধু কনস্টেবল নিয়োগ করিনি; মেধা, সততা ও দেশপ্রেমকে মূল্যায়ন করে ভবিষ্যতের জনগণের সেবক নির্বাচন করেছি। পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া ছিল শতভাগ স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক।

তিনি আরও বলেন, পুলিশের চাকরিতে টাকা লাগে—এ ধরনের প্রচারণা ভিত্তিহীন। কেউ যদি প্রতারণার নামে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করে, তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রাজশাহীর এবারের কনস্টেবল নিয়োগ কেবল ৪৯ জন তরুণ-তরুণীর চাকরি পাওয়ার গল্প নয়; এটি নিম্নআয়ের পরিবারের সন্তানদের জন্য একটি নতুন বার্তা। যেখানে একজন ফল বিক্রেতা, একজন কৃষকের মেয়ে কিংবা একজন চা-দোকানির ছেলে প্রমাণ করেছেন—মেধা, অধ্যবসায় ও সততা থাকলে সরকারি চাকরির স্বপ্ন পূরণ সম্ভব।

স্বচ্ছ নিয়োগের এই দৃষ্টান্ত সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে আস্থা তৈরি করেছে বলে মনে করেছেন সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘদিনের প্রচলিত ‘টাকা ছাড়া পুলিশের চাকরি হয় না’—এমন ধারণার বিপরীতে রাজশাহীর এবারের নিয়োগ যেন এক বাস্তব উদাহরণ হয়ে থাকল।