দীর্ঘ ৪০ বছর পর অবৈধ দখলদারদের কবল থেকে মুক্ত হলো বগুড়ার শিবগঞ্জ সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রায় ৪১ শতক সরকারি জমি। বিশাল এই ভূসম্পত্তির বর্তমান আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২৫ কোটি টাকা বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
শনিবার (১৬ মে) সকাল ৮টা থেকে শুরু হওয়া এক উচ্ছেদ অভিযানের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের এই হারানো সম্পত্তি পুনরুদ্ধার করা হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বারবার দাবি ও আপত্তি উপেক্ষা করে একটি প্রভাবশালী মহল দীর্ঘদিন ধরে ওই সরকারি জায়গা দখল করে রেখেছিল। সেখানে অবৈধভাবে পাকা মার্কেটসহ বিভিন্ন স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করে ভোগদখল করা হচ্ছিল। অভিযোগ রয়েছে, এই অবৈধ দখলদারদের মধ্যে প্রধান ব্যক্তি ছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আজিজুল হক। উদ্ধার হওয়া ৪১ শতক জমির মধ্যে প্রায় ২০ শতক জমিই ছিল তার একার দখলে।
শনিবারের অভিযানে এই বেদখল হওয়া জমিতে গড়ে ওঠা অবৈধ মার্কেট ও সমস্ত স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এ সময় উচ্ছেদ অভিযান দেখতে বিপুল সংখ্যক উৎসুক জনতার ভিড় জমে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ১১ মে অনুষ্ঠিত উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত সাধারণ সভায় কয়েকজন সদস্য শিবগঞ্জ সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের জমি দখলের বিষয়টি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এমপির নজরে আনেন।
জনগুরুত্বপূর্ণ এই অভিযোগটি শুনে প্রতিমন্ত্রী অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নেন এবং দ্রুত তদন্তপূর্বক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। প্রতিমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনার পর বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করে স্থানীয় প্রশাসন এবং তদন্তে সরকারি জমি অবৈধভাবে দখলের অকাট্য সত্যতা পাওয়া যায়। এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার সকালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা একযোগে এই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেন।
অভিযান সম্পর্কে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিয়াউর রহমান বলেন, "উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা সভায় বিষয়টি উত্থাপিত হওয়ার পর মাননীয় প্রতিমন্ত্রী মহোদয় এটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন। তদন্তে অবৈধ দখলের বিষয়টি শতভাগ প্রমাণিত হওয়ায় আমরা আইনানুযায়ী এই উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছি। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে বিদ্যালয়ের এই মূল্যবান সম্পত্তিটি বেদখলে ছিল। অবশেষে রাষ্ট্রীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এই সম্পদ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।"
এ বিষয়ে উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, "এটি শিবগঞ্জ সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের নিজস্ব সম্পদ ছিল। কিন্তু দীর্ঘ চার দশক ধরে একটি অসাধু ও প্রভাবশালী মহল গায়ের জোরে এই জায়গা দখল করে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপূরণীয় ক্ষতি করেছে এবং নিজেদের পকেট ভারী করেছে। এই সম্পদ উদ্ধার করে পুনরায় বিদ্যালয়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ায় মাননীয় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনকে সাধুবাদ জানাই।" বিদ্যালয়ের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আতাউর রহমান আবেগপ্লুত কণ্ঠে বলেন, "আমরা স্কুলের এই অবৈধ দখলকৃত জায়গাটি উদ্ধারের জন্য বিগত দিনে বহু সরকারি দপ্তর ও প্রভাবশালী মহলের দরজায় দরজায় ঘুরেছি। কিন্তু সব জায়গা থেকে নিরাশ হয়ে ফিরতে হয়েছিল।
আজ যে এই জমি উদ্ধার হবে তা ভাবতেও পারিনি। অবশেষে জায়গাটি মুক্ত হওয়ায় মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া এবং প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।"
অভিযানের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য অভিযুক্ত অবৈধ দখলদার ও সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা আজিজুল হকসহ অন্যদের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের মুঠোফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। এদিকে দীর্ঘদিনের দখলদারির অবসান ঘটায় এবং বিদ্যালয়ের হারানো সম্পদ ফিরে আসায় বর্তমান শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতন মহলের মধ্যে ব্যাপক স্বস্তি ফিরে এসেছে।
এলাকাবাসী বলছেন, সরকারি সম্পদ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জায়গা উদ্ধারে প্রশাসনের এই কঠোর ও আপসহীন পদক্ষেপ এলাকার জন্য একটি দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ হয়ে থাকবে।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ লুৎফর রহমান হীরা
হেড অফিসঃ ১/ জি,আদর্শ ছায়ানীড়, রিংরোড, শ্যামলী, আদাবর ঢাকা - ১২০৭।
স্বত্ব © ২০২৫ চলনবিলের সময়