৫০০ বছরের ইতিহাসের সাক্ষী ‘জয়সাগর দিঘি’ - চলনবিলের সময়

৫০০ বছরের ইতিহাসের সাক্ষী ‘জয়সাগর দিঘি’

লেখক: ডেস্ক রিপোর্ট, চলনবিলের সময়
প্রকাশ: July 12, 2025

294

সিরাজগঞ্জ সদর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার পশ্চিমে রায়গঞ্জ উপজেলার সোনাখাড়া ইউনিয়নের নিমগাছী ও গোঁতিথা গ্রামের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত এক ঐতিহাসিক জলাধার— ‘জয়সাগর দিঘি’। প্রায় ৫০০ বছর আগে খনন করা এই দিঘি আজও ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

 

প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী, সেন রাজবংশের রাজা অচ্যুত সেন ছিলেন গৌড়াধিপতি ফিরোজ শাহের করদ রাজা। ফিরোজ শাহের পুত্র বাহাদুর শাহ এক সময় রাজা অচ্যুত সেনের কন্যা, অপরূপা ভদ্রাবতীকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেন। রাজা সম্মতি না দিলে বাহাদুর শাহ কমলাপুর রাজধানী আক্রমণ করে ভদ্রাবতীকে অপহরণ করে নিমগাছীতে নিয়ে যান। পরবর্তীতে ১৫৩২-৩৪ খ্রিষ্টাব্দের দিকে রাজা অচ্যুত সেন এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে কন্যাকে উদ্ধারে সফল হন। এই বিজয় স্মরণেই তিনি বিশালাকৃতির দিঘি খনন করেন, যার নাম রাখেন ‘জয়সাগর’।

 

প্রথমদিকে এই দিঘির আয়তন ছিল প্রায় ৫৮ একর, দৈর্ঘ্য আধা মাইল এবং প্রস্থ ছিল তার সামান্য কম। দিঘির চারপাশে ছিল ২৮টি শানবাঁধানো ঘাট। তবে কালের গর্ভে এসব স্থাপনার আর কোনো চিহ্ন অবশিষ্ট নেই।

 

দিঘিটি নিয়ে আরও এক কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। অনেকের মতে, রাজা অচ্যুত সেন প্রকৃতপক্ষে ‘বিরাট রাজা’ নামেই পরিচিত ছিলেন। তিনি নিজের শক্তি প্রদর্শনের জন্য ১২ জন রাজাকে আমন্ত্রণ করে হত্যা করেন এবং পাপমোচনের উদ্দেশ্যে জয়সাগর দিঘি খনন করেন। কিন্তু দিঘিতে পানি উঠছিল না। পরে এক স্বপ্নে জানা যায়, ‘জয়কুমার’ নামের এক রাজপুত্র বেলের পাতা দিঘিতে রাখলে পানি উঠবে। রাজপুত্র দিঘিতে নামলে সত্যিই পানি উঠে যায়, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তিনি ডুবে মারা যান। শোকাহত স্ত্রী অভিশাপ দেন— এই দিঘির পানি যেন কারও কোনো কাজে না আসে।

 

এক সময় দিঘির পানি ব্যবহারের অনুপযোগী ছিল। দিঘির চারপাশে ছিল গভীর বনজঙ্গল আর অসংখ্য বেলগাছ। এখনও এলাকায় একটি প্রবচন চালু আছে: ‘যার মাথায় আছে তেল, সে খাবে জয়সাগরের বেল।

 

আশির দশক থেকে এই দিঘি লিজ নিয়ে গ্রামীণ মৎস্য ফাউন্ডেশন মাছ চাষ শুরু করে। বর্তমানে নিমগাছী সমাজভিত্তিক মৎস্য চাষ প্রকল্পের আওতায় সরকারিভাবেই মাছ চাষ করা হচ্ছে। শীতকালে দিঘিতে শত শত পরিযায়ী পাখির আগমন ঘটে, বাড়ে দর্শনার্থীর সংখ্যাও।

 

তবে দুঃখজনক হলেও সত্য— এত ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের স্থানে নেই কোনো রেস্টহাউস, বসার জায়গা, খাবার কিংবা স্যানিটেশনের সুব্যবস্থা। পর্যটকরা বাধ্য হয়েই বিড়ম্বনার শিকার হন।

 

সংরক্ষণ ও উন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করলে ‘জয়সাগর দিঘি’ হতে পারে রায়গঞ্জের একটি অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র— ইতিহাস, প্রকৃতি আর লোকগাথার সম্মিলিত সাক্ষ্যবাহক।