
সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, বিশেষ করে ঢাকা-১৩(মোহাম্মদপুর-আদাবর-শেরেবাংলা নগর) আসনের ফলাফল, ‘নির্বাচনকালীন অনিয়ম’ ও পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস।
সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর পুরানা পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মজলিস মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ এসব দাবি তুলে ধরেন।
লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের দিন ঢাকা-১৩ আসনে শুরু থেকেই অস্বাভাবিক ও পরিকল্পিতভাবে উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। বিভিন্ন কেন্দ্রে রিকশা প্রতীকের এজেন্টদের জোরপূর্বক বের করে দেওয়া, পর্দানশীন নারী ভোটারসহ সাধারণ ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হয়রানির অভিযোগ পাওয়া গেছে।
দলটির দাবি, কেন্দ্র পরিদর্শনে গেলে দলের আমির ও রিকশা প্রতীকের প্রার্থী মাওলানা মামুনুল হককে একটি কেন্দ্রে অবরুদ্ধ করে রাখা হয় এবং পরে সেনাবাহিনীর সহায়তায় তাকে কেন্দ্র ত্যাগে বাধ্য করা হয়। বিকাল সাড়ে চারটার দিকে একাধিক কেন্দ্র থেকে এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়। রেসিডেন্সিয়াল কলেজ কেন্দ্রসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে প্রধান নির্বাচনী এজেন্টকেও প্রবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগ করা হয়। একই সময়ে জাল ভোট ও ভোটার প্রভাবিত করার ঘটনাও ঘটে বলে দাবি তাদের।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাৎক্ষণিকভাবে অবহিত করা হলেও কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যায়নি; বরং দুষ্কৃতিকারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো গ্রেপ্তার হয়নি। ভোট গণনার সময় টেম্পারিং ও ওভাররাইটিংয়ের মাধ্যমে ধানের শীষ প্রতীকের ভোট অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি এবং রিকশা প্রতীকের হাজার হাজার বৈধ ভোট বাতিল করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তোলে দলটি। অভিযোগ নিষ্পত্তির আগেই নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করেছে, যা ভোটারদের সাংবিধানিক অধিকার উপেক্ষার শামিল বলে দাবি করা হয়।
লিখিত বক্তব্যে ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপি পদধারী রাজেশখানের নেতৃত্বে কেন্দ্র দখল ও উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টার অভিযোগও আনা হয়। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লাঠিচার্জে জনৈক হায়দার আলীসহ অনেকে আহত হন; পরে ২২ ফেব্রুয়ারি রাতে হায়দার আলী ইন্তেকাল করেন বলে জানানো হয়। মরহুমের মাগফিরাত কামনা ও পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে দলটি ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, বর্তমান সরকারের শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-১৩ আসনে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ববি হাজ্জাজ হায়দার আলীর মৃত্যুর আগেই হাসপাতালে উপস্থিত হয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দেন এবং মাওলানা মামুনুল হকসহ আলেম-উলামা ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করেন। তদন্তের আগে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে এমন অভিযুক্ত করা দায়িত্বশীল আচরণ নয় বলে মন্তব্য করা হয়।
দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, আলেম-উলামা ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে, যা আইনের শাসন ও মানবাধিকারের পরিপন্থী। রিকশা প্রতীকের সমর্থক, এজেন্ট ও নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, গ্রেপ্তার বা হয়রানি হলে তার দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে বলেও সতর্ক করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে নেত্রকোনা-১, সিলেট-৩, চট্টগ্রাম-৫, ফরিদপুর-২, শরীয়তপুর-১, সিরাজগঞ্জ-৩, মৌলভীবাজার-৪ ও গাজীপুর-৩ আসনসহ বিভিন্ন স্থানে এজেন্টদের বের করে দেওয়া, জাল ভোট ও ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ তুলে ধরা হয়। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ঢাকা-১৩সহ কয়েকটি আসনে সমর্থকদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করা হয়।
এছাড়া ২৩ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে মোহাম্মদপুরে জুলাই হত্যা মামলার সাক্ষী ও রিকশা প্রতীকের সমর্থক ইব্রাহিম খলিলের ওপর হামলার অভিযোগ তুলে তার হাতের হাড় ভেঙে যাওয়ার কথা জানানো হয়। এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে সংশ্লিষ্ট সাক্ষীদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানায় দলটি।
ছয় দফা দাবি
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের পক্ষ থেকে নিম্নোক্ত ছয় দফা দাবি উত্থাপন করা হয়—
১. ঢাকা-১৩ আসনের ফলাফল বাতিল করে নিরপেক্ষ তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ।
২. হায়দার আলীর মৃত্যুসহ ঢাকা-১৩ আসনের সার্বিক নির্বাচনী অনিয়মের বিচার বিভাগীয় তদন্ত।
৩. ইব্রাহিম খলিলের ওপর হামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।
৪. সারাদেশে ‘নির্বাচনী অনিয়ম’ তদন্তে স্বাধীন কমিশন গঠন।
৫. রাজনৈতিক হয়রানি ও মিথ্যা মামলা বন্ধ।
৬. সারাদেশে মজলিস নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের ওপর হামলা-মামলা ও হয়রানি বন্ধ।
সরকারকে অবিলম্বে এসব দাবির বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে জালালুদ্দীন আহমদ বলেন, ‘ঢাকা-১৩ কেবল একটি আসন নয়; এটি জনগণের ভোটাধিকার, ন্যায়বিচার ও গণবিশ্বাসের প্রশ্ন।’ জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় জাতীয় সংসদ, আদালত ও রাজপথে কর্মসূচি ঘোষণার মাধ্যমে আন্দোলনের পথে অগ্রসর হওয়ার কথাও জানান তিনি।