চলনবিলসহ উত্তরাঞ্চলজুড়ে খেজুর রস সংগ্রহে গাছিদের ব্যস্ততা

: বিশেষ প্রতিবেদক | চলনবিলের সময়
প্রকাশ: 2 months ago

276

শীত পুরোপুরি নামার আগেই উত্তরাঞ্চলের গাছিদের ঘরে নেমে এসেছে খেজুর রস সংগ্রহের মৌসুমের আমেজ। পাটালি ও লালি গুড় তৈরির লক্ষ্যে এখন চলছে গাছ পরিষ্কার ও প্রস্তুত করার কাজ। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই শুরু হবে পূর্ণমাত্রায় রস সংগ্রহ। এরপর টানা ৪-৫ মাস খেজুর রস ও গুড় প্রস্তুতিতে ব্যস্ত থাকবেন গাছিরা।

প্রতিবছর অক্টোবরের শেষ দিক থেকেই রাজশাহীর বাঘা, চারঘাট, পুঠিয়া এবং আশপাশের জেলাগুলোতে শুরু হয় খেজুর রস আহরণের মৌসুম। দিনের আলো কমতেই গাছে বসানো হয় মাটির হাঁড়ি। রাতভর ফোঁটা ফোঁটা রস জমে থাকতে থাকে এসব হাঁড়িতে। আর ভোরের আলো ফুটতেই গাছ থেকে নামানো হয় সেই রস। এরপর শুরু হয় চুলায় রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরির ঘ্রাণময় কর্মযজ্ঞ।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় বর্তমানে খেজুর গাছের সংখ্যা ১১ লাখ ৮ হাজারের বেশি। প্রতিটি গাছ থেকে গড়ে ২৫ লিটার রস পাওয়া যায়, যা থেকে প্রায় ১০ কেজি গুড় উৎপাদন সম্ভব। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলে রস সংগ্রহ। গত বছর রাজশাহীতে প্রায় ১০ হাজার টন গুড় উৎপাদিত হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ২০০ কোটি টাকা। এতে উপকৃত হয়েছেন প্রায় ৫০ হাজার গাছি—এ মৌসুমে উৎপাদন আরও বাড়বে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।

চারঘাটের চকগোচর গ্রামের গাছি ওবায়দুল জানান, তাঁদের গ্রামের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ এই কাজে যুক্ত। তবে অনেকে লাভের আশায় গুড়ে চিনি মেশাচ্ছেন, যা খাঁটি গুড়ের সুনামের জন্য হুমকি বলেও দাবি করেন তিনি। খাঁটি গুড়ের অনলাইন বাজার সম্প্রতি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে বলে জানান তিনি।

নওগাঁর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, বছরের পর বছর অবহেলায় পড়ে থাকা খেজুর গাছগুলোর এখন বাড়তি কদর। গাছ পরিষ্কার, নলি গাঁথা এবং ‘তোলা’র কাজ করতে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছেন গাছিরা। তাঁদের ভাষ্য—কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসেই গাছ তুলতে হয়। কয়েক দিন শুকানোর পর গাছের ওপরের অংশে চোখ কেটে নলি বসিয়ে শুরু হয় রস সংগ্রহ।

আত্রাইয়ের সাহাগোলায় নাটোরের লালপুর থেকে আসা গাছি সোহেল রানা ২৫ বছর ধরে এই কাজ করছেন। তিনি জানান, এবারও ৭০টির বেশি গাছ তোলা শুরু করেছেন। “শীত মৌসুমেই ভালো আয় হয়। তবে নতুন গাছির সংখ্যা কমে যাচ্ছে, আর খেজুর গাছও দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে,” বলেন তিনি।

সদর উপজেলার দিঘিরপাড়ের গাছি আকামত আলী জানান, আগে তিনি ১০০টির বেশি গাছ তুলতেন, এখন সে সংখ্যা নেমে এসেছে ৩০–৪০টিতে। তাঁর মতে, গাছ কমে যাওয়ায় একই হারে রস আহরণ সম্ভব হচ্ছে না। কাঁচা রস, পাটালি ও লালি গুড়—সবকিছুই তিনি বাজারজাত করেন। তবে এভাবেই গাছ কমতে থাকলে ভবিষ্যতে এলাকায় খেজুর গাছ পাওয়া দুষ্কর হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করেন তিনি।

এদিকে সিরাজগঞ্জের কাজিপুর, রায়গঞ্জ, তাড়াশ ও শাহজাদপুর উপজেলাগুলোর গাছিরাও নতুন মৌসুমকে সামনে রেখে ব্যস্ত সময় পার করছেন। গাছ পরিষ্কার, ডাল কাটা, নলি বসানোসহ সব প্রস্তুতিই চলছে পুরোদমে। মাটির হাঁড়ি ব্যবহার করাই প্রচলিত। এর ধারণক্ষমতা ৬–১০ লিটার। তবে কাঁচা রসের হাঁড়িতে চুন ব্যবহার করা হয় না।

তাড়াশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শর্মিষ্ঠা সেন গুপ্ত জানান, খেজুর গাছের আলাদা কোনো পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। বাড়ির আশপাশ, জমির আইল, পুকুরপাড় কিংবা সড়কের ধারে খেজুর গাছ লাগাতে কৃষকদের উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। পরিত্যক্ত জমিতে বাণিজ্যিকভাবে খেজুর বাগান গড়ে তুলতে পারলে কৃষকেরা আরও লাভবান হবেন বলেও তিনি মত দেন।

উত্তরাঞ্চলের গ্রামবাংলা জুড়ে এখন খেজুর রসের মৌসুম। শীত যত গভীর হবে, খেজুর রসের স্বাদ ততই বাড়বে—আর গাছিদের মুখে ফুটবে ততই হাসি।