স্বর্ণের অস্থির দামে বিপাকে ব্যবসায়ী ও ক্রেতা

: চলনবিলের সময়
প্রকাশ: 2 months ago

183

স্বর্ণ—বাঙালির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আবেগের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিবাহ, উৎসব, সামাজিক সম্মান কিংবা সঞ্চয়ের নিরাপদ ভরসা—সব ক্ষেত্রেই স্বর্ণের অবস্থান ছিল স্থিতিশীল বিশ্বাসের জায়গায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি ও প্রতিনিয়ত ওঠানামা সেই বিশ্বাসে বড় ধরনের ধাক্কা দিচ্ছে। একদিন দাম বাড়ছে, পরদিন কমছে—এমন অনিশ্চয়তা বাজারে সৃষ্টি করেছে অস্বাভাবিক অস্থিরতা। ফলে বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ী ও সাধারণ ক্রেতা উভয়েই।

স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারের দাম প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হওয়ায় তারা ঠিকমতো কাঁচামাল কিনতে পারছেন না। এক দামে স্বর্ণ কিনে আরেক দামে বিক্রি করলে লোকসানের ঝুঁকি থাকে, আবার অপেক্ষা করলে ব্যবসা থমকে যায়। অনেক আড়ত ও খুচরা বিক্রেতা বাধ্য হয়ে নতুন অর্ডার নেওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত বাজারেও দেখা দিয়েছে লেনদেনের গতি হ্রাস, যা পুরো স্বর্ণশিল্পকেই ধীরে ধীরে সংকটে ঠেলে দিচ্ছে।

অন্যদিকে সাধারণ ক্রেতাদের অবস্থা আরও করুণ। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো নিজেদের প্রয়োজন বা সখের গহনা বানাতে পারছেন না। কেউ বিয়ের কেনাকাটা পিছিয়ে দিচ্ছেন, কেউ অর্ধেক বাজেট কমিয়ে আনছেন। অনেকেই স্বর্ণের পরিবর্তে বিকল্প ধাতু বা কৃত্রিম গহনার দিকে ঝুঁকছেন, যা বাজারের সামগ্রিক ভারসাম্য আরও নষ্ট করছে।

তাছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ, ডলার–টাকার বিনিময় হারের অস্থিরতা, আমদানিনির্ভরতা, কর-শুল্ক বৃদ্ধি এবং আন্তঃবাজার সমন্বয়ের ঘাটতি—সব মিলিয়ে দাম স্থিতিশীল রাখা দুষ্কর হয়ে উঠছে। স্বর্ণের বাজারে কোনো পূর্বাভাস বা নীতিগত নির্দেশনা না থাকায় ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে পারছেন না। এর প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানেও; বহু দোকান ও কারখানায় কমে এসেছে নতুন কাজের অর্ডার, হুমকিতে পড়ছে স্বর্ণকারদের জীবিকাও।

এ অবস্থায় বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ও সরকারের সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। স্বর্ণের আমদানি নীতি সহজ করা, কর কাঠামো যৌক্তিক করা, মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজার পর্যবেক্ষণ জোরদার করা—এগুলো না হলে সংকট গভীরতর হবে। পাশাপাশি দৈনিক মূল্য পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের আগে থেকেই সঠিক তথ্য সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে বাজারে অযথা গুজব, আতঙ্ক ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি না হয়।

স্বর্ণ শুধু একটি পণ্য নয়—এটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সংস্কৃতি ও মানুষের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রতীক। তাই এই বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। অনিশ্চয়তার দোলাচলে ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের আর ভুগতে দেওয়া যায় না।