চলনবিলে মাছের আকাল: বন্ধ হয়ে যাচ্ছে শতাধিক শুঁটকি চাতাল, বেকার শ্রমিকরা

: বিশেষ প্রতিবেদক | চলনবিলের সময়
প্রকাশ: 1 week ago

36

মাছের রাজ্য হিসেবে পরিচিত চলনবিলে এবার নেমে এসেছে নজিরবিহীন মাছের সংকট। বিলে পর্যাপ্ত মাছ না পাওয়ায় চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে শুঁটকি উৎপাদনকারী চাতালগুলো। মৌসুমের শুরুতেই একের পর এক চাতাল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ধস নেমেছে শুঁটকি উৎপাদনে, অর্জিত হয়নি উৎপাদন লক্ষ্যের সামান্য অংশও।

সরেজমিনে ঘুরে ও চাতাল মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতি বছর আশ্বিন-কার্তিক মাসে বিলের পানি নামতে শুরু করলে নানা প্রজাতির ট্যাংরা, পুঁটি, খলসে, বাতাসি, চেলা, মলা, টাকি, বাইম, শোল, বোয়াল, গজার, মাগুর, শিং ও কইসহ প্রচুর মাছ ধরা পড়ে। দামও তুলনামূলক কম থাকে। তখন এসব মাছ দিয়েই চলে ব্যাপক শুঁটকি উৎপাদন।
কিন্তু চলতি বছর পরিস্থিতি একেবারেই উল্টো। অগ্রহায়ণ মাসে যখন শুঁটকি মৌসুম পুরোদমে থাকার কথা, তখনই বিলে মাছ পাওয়া যাচ্ছে না বললেই চলে। ফলে অনেক চাতাল এখন পুরোপুরি বন্ধ।
চাটমোহরের চাতাল মালিক আ. সামাদ জানান, গত বছর আমার চাতালে প্রায় ৮০ টন শুঁটকি উৎপাদন হয়েছিল। এবার হয়তো ১০-১৫ টনও হবে না। মাছ কম, দাম বেশি, শ্রমিকের মজুরিও বেড়েছে। লোকসান ছাড়া আর কিছুই নেই।
বিল এলাকার আরেক ব্যবসায়ী আব্দুল গফুরসহ একাধিক চাতাল মালিকের ভাষ্য—মাছের ঘাটতির কারণে উৎপাদনের খরচ বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। ক্রমেই অলাভজনক হয়ে উঠছে এ ব্যবসা।
মোহিষলুটির চাতাল মালিক পলান হোসেন বলেন,এবার মাছ নাই বেকার বসে দিনকাচাচ্ছি। অন্য বছরগুলোতে কাজে ব্যস্ত সময় পার করতাম, এবার মাছ না কাজ নাই।
চলনবিল অঞ্চলের হবি শেখ, দেলবর হোসেন, আলমাস হোসেন, মোফাজ্জল হোসেন ও বিভিন্ন চাতালের শ্রমিকরা জানান, পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে ইতোমধ্যেই অন্তত ১৫০টি চাতাল বন্ধ হয়ে গেছে। বাকিগুলোও বন্ধ হওয়ার পথে। প্রায় পাঁচ হাজার নারী-পুরুষ শ্রমিক এখন বেকার হওয়ার আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
প্রতিটি চাতালে ১০ থেকে ২০ জন শ্রমিক কাজ করেন, যার মধ্যে নারীর সংখ্যা বেশি। আশ্বিন-কার্তিক থেকে মাঘ-ফাল্গুন পর্যন্ত মৌসুমে এসব শ্রমিকের আয়েই চলত তাদের সংসার। তিন মণ কাঁচা মাছ শুকিয়ে এক মণ শুঁটকি পাওয়া যায়। এখন মাছই না থাকায় মৌসুমের শুরুতেই থমকে গেছে কর্মসংস্থান।
চাটমোহরের চাতাল মালিক আলমাস উদ্দিন বলেন, চলনবিলে ‘সাবাড় বাহিনী’ নামে পরিচিত একটি অসাধু চক্র কারেন্ট ও বাদাই জাল দিয়ে নির্বিচারে মাছসহ জলজপ্রাণি নিধন করছে। এতে শুধু বর্তমান মৌসুমের মাছই নয়, ভবিষ্যৎ প্রজনন ব্যবস্থাও হুমকির মুখে পড়ছে। ফলে মাছের উৎপাদন কমে যাওয়াই স্বাভাবিক।
চাটমোহরের সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আব্দুল মতিন জানান, ক্ষণস্থায়ী বন্যা, চায়না দুয়ারি, কারেন্ট ও বাদাই জাল দিয়ে বেপরোয়া মাছ শিকারের কারণে চলনবিলে মাছের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে। এছাড়া কৃষিজমিতে কীটনাশক ও ঘাসমারা বিষ ব্যবহার মাছ ও জলজপ্রাণির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
তিনি আরও বলেন, চলনবিলের শুঁটকির বাজার সারা দেশে রয়েছে। কিন্তু এবার উৎপাদন অনেক কম হবে। শুঁটকি মাছ সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য আধুনিকীকরণ প্রয়োজন। না হলে এ শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ জুড়ে বিস্তৃত চলনবিল অঞ্চলের কয়েক হাজার পরিবার বহু বছর ধরে শুঁটকি উৎপাদন ও বিপণনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এবার মাছের সংকট তাদের জীবিকা বিপন্ন করে তুলেছে। শুঁটকি শিল্পের এই ধস থামাতে না পারলে বেকারত্ব ও দারিদ্র্য আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।