‘স্কুলে গেলে বুক ধড়ফড় করে, আল্লাহর নাম নেওয়া ছাড়া উপায় নেই’

: ভাঙ্গুড়া উপজেলা প্রতিনিধি
প্রকাশ: 1 month ago

149

পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার কৈডাঙ্গা সহ প্রায় ১৫টি গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা বছরের পর বছর ঝুঁকির মধ্যেই চলছে। গুমানী নদীর ওপর একটি স্থায়ী সেতু না থাকায় বাধ্য হয়ে রেলসেতুকে একমাত্র ভরসা বানিয়েছেন প্রায় ২৫ হাজার মানুষ। ভোর থেকে রাত— প্রতিদিনই প্রাণ হাতে নিয়ে ওই সেতু পার হতে হয় স্কুলের শিশুসহ সব বয়সী মানুষকে। অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও আজও বাস্তবায়িত হয়নি বহু কাঙ্ক্ষিত সেতু নির্মাণের কাজ।

গুমানী নদী ভাঙ্গুড়া উপজেলা জুড়ে পূর্ব–পশ্চিমে বয়ে গেছে। এর দুই তীর ঘেঁষে কৈডাঙ্গা, নতুনপাড়া, পাঁচবেতুয়ান, বড়বেতুয়ান, বিলেরবাড়ী, চরভাঙ্গুড়া, এরশাদনগর, সুজা, চাচকিয়া, কালিয়াকৈর, পুইবিল, লক্ষ্মীকোল, দিলপাশা সহ ১৫টিরও বেশি গ্রাম অবস্থিত। বর্ষায় নদী থাকে টইটম্বুর, শুষ্ক মৌসুমেও থাকে পর্যাপ্ত পানি— ফলে নৌকা ছাড়া সহজে পারাপারের কোনো সুযোগ নেই।

যা আছে তা হলো— একটি খেয়া নৌকা ও পুরনো একটি রেলসেতু। কিন্তু দিনের আলো ফুরোতেই খেয়া বন্ধ হয়ে যায়। আবার নৌকাভাড়া অনেকের জন্যই বাড়তি চাপ। তাই বাধ্য হয়ে রেলসেতুকেই একমাত্র ভরসা বানাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। ট্রেনের শব্দ শোনা মাত্রই পিলে চমকে ওঠে সবার। প্রায়ই ঘটে দুর্ঘটনা; কেউ পানিতে লাফ দিয়ে প্রাণ বাঁচায়, কেউ আবার আহত কিংবা নিহত হয়।

স্কুল ছুটির পর রেলসেতু দিয়ে শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি নিয়ে ফেরার দৃশ্য এখন নিয়মিত। কারও মাথায় বইয়ের ব্যাগ, কারও কোলে বাচ্চা— সবাইকে একই ঝুঁকি পেরোতে হয়।

রেল সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় শহিদ নামের এক ব্যক্তি বলেন,
‘এভাবেই আমাদের যাতায়াত করতে হয়। দিনে কয়েকবার এপার–ওপার যেতে হয়। সব সময় নৌকা ভাড়া দিয়ে যাতায়াত করা সম্ভব না। ট্রেন এলে কখনো রেলের পাশের পাত ধরে দাঁড়াই, কখনো পানিতে ঝাঁপ দিই। না হলে বাঁচার কোনো রাস্তা থাকে না।’

চরভাঙ্গুড়ার কৃষক আমজাদ বলেন,
‘আমাদের বেশিরভাগ জমি নদীর ওপাশে। ফসল আনতে ১০–১৫ কিলোমিটার ঘুরে যেতে হয়। শুধু একটা ব্রিজ হলে এই কষ্ট থাকতো না। বহুবার নেতাদের বলেছি, সবাই শুধু আশ্বাসই দেয়।’

বাচ্চা কোলে রেলসেতু পার হওয়া আমেনা খাতুনের কণ্ঠে ঝরে পড়ল অসহায়ত্ব—
‘রিস্ক আছে জানি। কিন্তু বাজারে যাওয়া লাগলে কী করব? না গেলে তো উপায় নাই।’

কৈডাঙ্গার খুরশিদা বেগম বলেন,
‘বাচ্চারা যখন স্কুলে যায়, তখন বুক ধড়ফড় করে। আল্লাহ আল্লাহ করি, যেন ট্রেন না আসে। আমরা বড়রা কোনোমতে সামলে নেই, কিন্তু ছোটরা ভয় পায় খুব। প্রতিদিনই টেনশনে থাকতে হয়।’

বেতুয়ান গ্রামের কোরবান আলী বলেন,
‘প্রতি বছরই রেলসেতুতে দু’একজন মানুষ মারা যায়। নদীর ওপর ব্রিজ হলে আমরা স্বস্তিতে চলাচল করতে পারতাম।’

এ বিষয়ে পাবনা সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. সাদেকুর রহমান জানান,
‘গুমানী নদীর ওই পয়েন্টে সেতুর প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে আমরা অবগত। শিশু ও স্থানীয়দের ঝুঁকিপূর্ণ পারাপারের কারণে বিষয়টি পরিকল্পনায় রাখা হয়েছে। ভবিষ্যতে নতুন কোনো প্রকল্প পেলে এখানে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’