
পটুয়াখালীর সমুদ্রতীরবর্তী জনপদে দিন শুরু হয় ঢেউয়ের গর্জনে। এখানকার মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে সমুদ্র। ভোরের আলো ফোটার আগেই কিংবা গভীর রাতের অন্ধকারে জীবিকার সন্ধানে জেলেরা নৌকা ভাসান উত্তাল সাগরে। অন্ধকারের বুকে জাল ছুড়ে দিয়ে তারা শুরু করেন প্রতিদিনের সংগ্রাম।
কাঁধে ভারী জালের চাপ, হাতে দড়ির শক্ত দাগ—এসব যেন জেলেদের পরিচয়চিহ্ন। ঝড়ো হাওয়া, হঠাৎ ঢেউ আর বৈরী আবহাওয়ার সঙ্গে লড়াই করেই তাদের দিন কাটে। প্রতিটি যাত্রায় লুকিয়ে থাকে মৃত্যুর আশঙ্কা, তবুও জীবনের তাগিদে তারা পিছু হটেন না। ক্ষুধার দাহ আর সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর দায়—এই দুইয়ের টানেই তারা বারবার সমুদ্রের গভীরে নেমে যান।
সমুদ্রে যখন ঝড় ওঠে, তখন তীরের ঘরগুলোতে শুরু হয় আরেক যুদ্ধ—অপেক্ষার যুদ্ধ। জেলেপল্লির প্রতিটি ঘরে সন্ধ্যা নামলেই জ্বলে ওঠে প্রদীপ। স্ত্রীদের চোখে উৎকণ্ঠা, মুখে নীরব প্রার্থনা—স্বামী যেন নিরাপদে ফিরে আসে। ঝড়ো রাতে নৌকা দুলে ওঠার খবর বা আকাশে বজ্রপাতের শব্দ তাদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তোলে।
জেলেদের জীবনসংগ্রাম শুধু প্রকৃতির সঙ্গে লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নয়। সমুদ্রে হাঙরের ভয়, বড় মাছের সঙ্গে সংঘর্ষে রক্তাক্ত হাত—এসব ঝুঁকি প্রতিনিয়ত তাদের সঙ্গী। তবুও তারা জাল ছাড়ে না। কারণ, এই সমুদ্রই তাদের জীবনের একমাত্র অবলম্বন। কঠিন বাস্তবতার মাঝেও তাদের মুখে হাসি দেখা যায়—যেন জীবনের সঙ্গে লড়াই করাই তাদের অভ্যাস।
ভোরের লালিমায় যখন নৌকা ফিরে আসে তীরে, তখন ক্লান্ত শরীর আর লবণে মাখা মুখ নিয়েও জেলেদের চোখে জ্বলে ওঠে স্বস্তি। হাতে ধরা কয়েকটি মাছই হয়ে ওঠে পরিবারের দিনের আশা। এই সামান্য আয়ে চলে সংসার, গড়ে ওঠে সন্তানের ভবিষ্যতের স্বপ্ন। দারিদ্র্যের শৃঙ্খলে বাঁধা থাকলেও আত্মসম্মান আর সাহস নিয়ে তারা মাথা উঁচু করেই দাঁড়িয়ে থাকেন।
পটুয়াখালীর জেলেরা তাই শুধু শ্রমজীবী মানুষ নন, তারা সমুদ্রের সন্তান। সমুদ্র তাদের কাছে কখনো শত্রু, কখনো নির্মম বন্ধু। প্রতিটি ঢেউয়ে লেখা আছে তাদের রক্তে রাঙানো জীবনের গল্প, ত্যাগ আর সংগ্রামের ইতিহাস। সূর্য যখন পশ্চিমে ঢলে পড়ে, তখনও তাদের বিশ্রামের অবকাশ নেই—আবারও জাল হাতে নামতে হয় সাগরের পথে।
জেলেদের এই জীবনসংগ্রাম কেবল একটি পেশার গল্প নয়; এটি সাহস, ধৈর্য আর অদম্য মানসিকতার প্রতিচ্ছবি। পটুয়াখালীর তীরভূমিতে প্রতিদিনই রচিত হচ্ছে এই নীরব সংগ্রামের ইতিহাস, যা আমাদের সমাজ ও অর্থনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।