
মার্কিন বিচার বিভাগের প্রকাশিত সর্বশেষ এপস্টেইন ফাইলে ভারতীয় ধনকুবের অনিল আম্বানীকে নিয়ে বিস্ফোরক তথ্য উঠে এসেছে। এতে দাবি করা হয়েছে, এপস্টেইন ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ভারতের শিল্পগোষ্ঠী রিলায়েন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান অনিল আম্বানির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন।
শনিবার (০৭ ফেব্রুয়ারি) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রকাশিত নথিতে দেখা গেছে, এপস্টেইন ও অনিল আম্বানি বিশ্ব রাজনীতি, ব্যবসা এবং ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন এবং সাক্ষাতের পরিকল্পনাও করেছিলেন। ২০১৭ সালের ৯ মার্চের এক বার্তায় অনিল আম্বানি এপস্টেইনকে লেখেন, তুমি কাকে প্রস্তাব করো। জবাবে এপস্টেইন লেখেন, ভ্রমণটা আনন্দদায়ক করতে একজন লম্বা সুইডিশ স্বর্ণকেশী নারী। এর ২০ সেকেন্ডের মধ্যেই আম্বানি উত্তর দেন, এটা ব্যবস্থা করো।
এতে বলা হয়েছে, ওই বছর প্যারিসে সাক্ষাতের পরিকল্পনা থাকলেও তারা একে অপরকে মিস করেন। এছাড়া ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঘিরে প্রতিক্রিয়া নিয়েও তাদের মধ্যে আলোচনা হয়।
২০১৯ সালের মে মাসে নিউইয়র্ক সফরের পরিকল্পনার কথা জানালে এপস্টেইন অনিল আম্বানিকে নিজের বাসভবনে আমন্ত্রণ জানান। তিনি লেখেন, আপনি যদি কাউকে নীরবে সাক্ষাৎ করতে চান, আমাকে জানান। নথিতে বলা হয়েছে, নিউইয়র্কের আপার ইস্ট সাইডে এপস্টেইনের বাড়িতে দুজনের সাক্ষাৎ হয়েছিল।
এনডিটিভি জানিয়েছে, এ বিষয়ে অনিল আম্বানির প্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
নথিতে আরও বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে এপস্টেইন আম্বানি পরিবার নিয়ে লেখা একাধিক ডিজিটাল বই অর্ডার করেছিলেন। এর মধ্যে আম্বানি অ্যান্ড সন্স এবং স্টর্ম ইন দ্য সি উইন্ড: আম্বানি ভার্সেস আম্বানি। এসব বই থেকে তিনি পরিবারের ইতিহাস ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
প্রকাশিত বার্তাগুলোতে এপস্টিনের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন ও নিজের অবস্থান জাহির করার প্রবণতাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০১৯ সালে সাক্ষাতের পর এপস্টেইন অনিল আম্বানিকে এক বার্তায় লেখেন, আজকের সাক্ষাৎটা দারুণ ছিল, তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে ভালো লাগল।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি মার্কিন বিচার বিভাগের প্রকাশ করা এপস্টেইনসংক্রান্ত আরও প্রায় ৩০ লাখ পৃষ্ঠার নতুন নথি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবারও আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। যৌন অপরাধী ও মার্কিন ধনকুবের জেফরি এপস্টেইনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নথিপত্র মার্কিন রাজনীতি ও বিশ্বজুড়ে এক বিশাল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
দীর্ঘ সময় ধরেই এই নথি প্রকাশের দাবিতে চাপ তৈরি করা হচ্ছিল। যার পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্প প্রশাসন নথি প্রকাশে বাধ্য হয়েছে। এমনকি রিপাবলিকান পার্টির ভেতর থেকেও স্বচ্ছতার দাবি ওঠে। শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অনুমতিক্রমে এপস্টেইন ফাইলসের কিছু অংশ আদালতের মাধ্যমে জনসমক্ষে আসে।
গত ৩০ জানুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্রে এপস্টেইনের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং ও যৌন অপরাধের তদন্তের সঙ্গে যুক্ত ৩০ লাখের বেশি পৃষ্ঠার নথি, ১ লাখ ৮০ হাজার ছবি ও ২ হাজার ভিডিও প্রকাশ পায়। এই নথি শুধু একটি সাধারণ মামলা সংক্রান্ত নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে পরিচালিত একটি বিশাল নেটওয়ার্ক। জেফরি এপস্টেইনের অপরাধের ইতিহাস দীর্ঘ এবং বিতর্কিত। ২০০৮ সালে ফ্লোরিডার পাম বিচে এক কিশোরীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে প্রথম তদন্ত শুরু হয়। সে সময় তিনি প্রভাব খাটিয়ে প্রসিকিউটরদের সঙ্গে একটি আপিল চুক্তির মাধ্যমে বড় সাজা থেকে বেঁচে যান, তবে এরপর থেকেই যৌন অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হন।
১১ বছর পর, ২০১৯ সালে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের দিয়ে যৌন ব্যবসার নেটওয়ার্ক চালানোর অভিযোগে এপস্টেইন গ্রেপ্তার হন । বিচারের অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় তিনি কারাগারে রহস্যজনকভাবে মৃত্যু বরণ করেন। যদিও সরকারিভাবে তার মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে ঘোষণা করা হয়, তবে আসলেই তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছে তা নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে। এই দীর্ঘ তদন্ত প্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য, এপস্টেইনের বিভিন্ন সম্পত্তিতে অভিযান চালিয়ে সংগৃহীত নথিপত্র, ইমেইল এবং যোগাযোগসংক্রান্ত দলিল সংগ্রহ করা হয়। এভাবেই জন্ম নেয় এপস্টেইন ফাইলস নামের বিশাল নথিপত্র।