
একটি গ্রামের সাধারণ ছেলে থেকে ট্যালেন্টপুলে উপজেলা সেরা—ভাঙ্গুড়ায় সৃষ্টি হলো অনুপ্রেরণার নতুন ইতিহাস।
প্রতিটি মহান সাফল্যের পেছনে থাকে একটি স্বপ্ন, একটি সংগ্রাম এবং একজন পথপ্রদর্শকের আলোকিত ছায়া। সেই সত্যেরই এক জীবন্ত উদাহরণ সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার এক সাধারণ পরিবারের সন্তান ফাহিম শাহরিয়ার মাহি। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও অসীম সাহস, মেধা এবং অদম্য অধ্যবসায়ের মাধ্যমে সে আজ হয়ে উঠেছে সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
মাহির পিতা মোঃ নুরুজ্জামান (ডলার) একজন পরিশ্রমী ব্যবসায়ী এবং মাতা একজন স্নেহময়ী গৃহিণী। ছেলের মেধার দীপ্তি খুব অল্প বয়সেই উপলব্ধি করেন তার বাবা। সেই উপলব্ধি থেকেই জন্ম নেয় এক স্বপ্ন—ছেলেকে একজন যোগ্য, শিক্ষিত এবং আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের দৃঢ় প্রত্যয়ে পরিবারটি গ্রামের পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে চলে আসে পাবনা জেলার ভাঙ্গুড়া উপজেলায়—শুধু সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার আশায়।
ভাঙ্গুড়ায় এসে মাহিকে ভর্তি করা হয় শরৎনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়-এ। অল্প সময়ের মধ্যেই তার অসাধারণ মেধা, গভীর মনোযোগ এবং শৃঙ্খলাবোধ শিক্ষকদের মুগ্ধ করে। প্রতিটি পরীক্ষায় কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জন করে সে দ্রুতই সবার নজরে আসে। ২০২৩ সালে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির পর সে ভর্তি হয় ভাঙ্গুড়া ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়-এ, যেখানে তার সাফল্যের ধারা আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
কিন্তু মাহির জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে তখন, যখন তার বাবার স্বপ্ন—তাকে ক্যাডেট কলেজে ভর্তি করানো—বাস্তবতার কঠিন দেয়ালে বাধা পায়। ভাঙ্গুড়ায় কোনো ক্যাডেট কোচিং ছিল না, আর দূরে পাঠানোর সুযোগও সীমিত ছিল। ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে আলোর দিশারি হয়ে এগিয়ে আসেন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক মোঃ ঠান্টু আলম। তিনি মাহির অসাধারণ সম্ভাবনা অনুধাবন করে তাকে কেন্দ্র করেই প্রতিষ্ঠা করেন “ভাঙ্গুড়া ক্যাডেট কোচিং”—যা শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, বরং একটি স্বপ্নের কারিগর হয়ে ওঠে।
এই প্রতিষ্ঠানে মাহি শুরু করে তার কঠোর প্রস্তুতি। দিনের পর দিন নিরলস পরিশ্রম, শিক্ষকের নিবিড় তত্ত্বাবধান এবং নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তির সমন্বয়ে সে নিজেকে গড়ে তোলে এক অনন্য উচ্চতায়। বিশেষ করে ইংরেজি ভাষার উপর তার দক্ষতা হয়ে ওঠে বিস্ময়কর। ব্যাকরণ, অনুবাদ, রচনা, বক্তৃতা—প্রতিটি ক্ষেত্রে তার সাবলীলতা ও আত্মবিশ্বাস তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে। শুধু একজন শিক্ষার্থী হিসেবেই নয়, সে এখন নিজেই দক্ষতার সাথে ইংরেজি ক্লাস পরিচালনা করতে পারে—যা তার অসাধারণ প্রতিভার এক বিরল নিদর্শন।
২০২৫ সালে মাহি ক্যাডেট কলেজ ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে এবং লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তার মেধার শক্ত ভিত প্রমাণ করে। যদিও চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হতে পারেনি, তবুও সে ভেঙে পড়েনি। বরং ব্যর্থতাকে শক্তিতে রূপান্তর করে নতুন উদ্যমে এগিয়ে যায় তার স্বপ্নের পথে।
একই বছরে অনুষ্ঠিত জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে মাহি ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি অর্জন করে এবং সমগ্র ভাঙ্গুড়া উপজেলার মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে এক অবিস্মরণীয় গৌরব অর্জন করে। এই সাফল্য শুধু তার ব্যক্তিগত অর্জন নয়—এটি একটি পরিবারের স্বপ্নের জয়, একজন শিক্ষকের শ্রমের স্বীকৃতি এবং একটি জনপদের গর্ব।
আজ মাহি শুধু একটি নাম নয়—সে একটি অনুপ্রেরণা, একটি সাহসের গল্প, একটি সম্ভাবনার প্রতীক। তার জীবন প্রমাণ করে—পরিস্থিতি নয়, মানুষের দৃঢ় সংকল্পই তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।
মাহির স্বপ্ন এখন সীমাহীন। সে বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে নিজেকে একজন যোগ্য, সৎ এবং আদর্শ মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। তার চোখে এখন শুধু নিজের সাফল্যের স্বপ্ন নয়, বরং দেশের জন্য কিছু করার দৃঢ় অঙ্গীকারও জ্বলজ্বল করছে।
ফাহিম শাহরিয়ার মাহির এই অসাধারণ পথচলা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
স্বপ্ন দেখার সাহস, পরিশ্রম করার মানসিকতা এবং সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে—একজন সাধারণ মানুষও হয়ে উঠতে পারে অসাধারণ।
তার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য রইল আন্তরিক দোয়া ও শুভকামনা।