
কবি শামসুর রাহমান নাগরিক কবি ছিলেন। কিন্তু তার মধ্যে ছিল শেকড়ের টান। গ্রামের প্রকৃতি, মেঘনা নদীর ঢেউয়ের কলকলানি শব্দ এবং গ্রামের পাশ দিয়ে ট্রেনের শব্দকেও কবি ভালোবেসেছিলেন। নগরে জন্ম ও বসবাস করলেও শামসুর রাহমান তার কবিতায় গ্রামকে হৃদয়ে ধারণ করেছেন।
রোববার (২২ মার্চ) বিকেলে কবি শামসুর রাহমানের পৈত্রিক বাড়ি নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার পাড়াতুলী গ্রামের নিজ বাড়িতে ‘ঈদ পুনর্মিলনী ও কবি শামসুর রাহমান স্বরণে আলোচনা সভায়’ এসব কথা বলেন বক্তারা। ঢাকা ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অব রায়পুরা (ডুসার) এই আলোচনা সভার আয়োজন করে।
সভায় নরসিংদী সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. মিরাজ ভূইয়া বলেন, নান্দনিক লেখক হিসেবে কবি শামসুর রাহমানের অসম্ভব গ্রহণযোগ্যতা আছে। যার গর্বিত অংশই তার এলাকার মানুষ। পাড়াতুলী গ্রামে তার স্মৃতি আছে। এই মাটিতে তার পদচারণ হয়েছে। যদিও তিনি ঢাকায় নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেছেন কিন্তু একটা পর্যায়ে তিনি শেকড়ে এসেছেন। পাড়াতুলীর বাড়িতে এসেই কবির বিয়োগান্তক কবিতা একটি ফটোগ্রাফ লিখেছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা তুমি, তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা এই কবিতাগুলো অজপাড়া গ্রামে বসেই লিখেছিলেন। শেকড়ের প্রতি যে কবির একটা আত্মিক টান ছিল সেটা তার কবিতাতেই প্রকাশ পেয়েছে। মানুষ যতই ওপরে উঠুক না কেন যদি শেকড়কে চিনতে ভুল করেন তা অর্থহীন।
তিনি বলেন, শামসুর রাহমান নাগরিক কবির পাশাপাশি প্রতিবাদী কবিও ছিলেন। তার কবিতায় আইয়ুব খানের শাসনের বিরুদ্ধে ও উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময়ের প্রতিবাদও ছিল। দেশমাতৃকার কল্যাণে লেখনীর মাধ্যমে ভূমিকা রেখেছেন। একজন মানুষকে জানতে হলে, তাকে ধারণ করতে হলে, তার লেখনী পড়তে হবে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শেকড়ের টানেই এসেছে। অনেকে অনেক বড় জায়গায় যাবে কিন্তু শেকড় যেটা তা ধরে রাখতে হবে।
জনতা ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার ও ডুসার এর ছাত্র উপদেষ্টা মুসলিম উদ্দিন বলেন, রায়পুরায় কবি শামসুর রাহমান, বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান, কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ, ভাষাবিদ মো. মনিরুজ্জামানসহ বহু খ্যাতিমান মানুষের জন্ম হয়েছে। তারা দেশের জন্য অবদান রাখার মধ্য দিয়ে নিজ এলাকাকেও গর্বিত করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাদেরকে ধারণ করে দেশের কল্যাণে কাজ করবে এটাই প্রত্যাশিত।
অ্যাক্সেস টু ইনফরমেশনের ডাটা সমন্বয় কর্মকর্তা ও ডুসার এর স্থায়ী উপদেষ্টা ফয়সাল আহমেদ বলেন, কবি শামসুর রাহমানের পিতৃভূমিতে এসে তাকে নিয়ে স্মরণ সভা করা গর্বের। রায়পুরার ইতিহাসকে যারা রঙিন করেছেন আমরা তাদের সেই মিছিলে শামিল হতে চাই। শিক্ষার্থীদের চিন্তা ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাদের কাজগুলো প্রতিফলিত হোক, যাতে শিক্ষার্থীরাও তাদের মতো হতে পারেন।
ডুসার স্থায়ী উপদেষ্টা রহমত উল্লাহ বলেন, শামসুর রাহমান নগরকে ভালোবেসেছিলেন। কিন্তু তিনি তার গ্রামকে ভুলে যাননি। তিনি গ্রামে এসেছেন, গ্রামকে ভালোবেসেছেন। এইজন্যই তিনি গ্রামের প্রকৃতি, মেঘনা নদী ঢেউয়ের কলকলানি শব্দ এবং নিজ উপজেলার ওপর দিয়ে চলে যাওয়া ট্রেনের শব্দকেও কবি ভালোবেসেছিলেন। তাইতো কবি শিশুদের জন্য ঝকঝকা ঝক ট্রেনে চলেছে শব্দে কবিতা লিখেছেন, ধান ভানলে কুড়ো দিবো শিশুতোষ ছড়া, কবিতা সাহিত্য রচনা করেছেন।
নগরে জন্ম ও বসবাস করলেও শামসুর রাহমান তার কবিতায় গ্রামকে হৃদয়ে ধারণ করেছেন—এটাই তার কবিতার একটি বিশেষত্ব।
ডুসার সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান সৈকতের সঞ্চালনায় এবং সহসভাপতি রাশেদা আক্তারের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিসন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির ব্যবস্থাপক (অ.দা.) শাহীন মিয়া, মাক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির সহকারী পরিচালক ও ডুসার ছাত্র উপদেষ্টা মো. আল আমিন, হাবিবুর রহমান সাগর, ডুসার প্রচার সম্পাদক জসিম মিয়া প্রমুখ।
এর আগে কবি শামসুর রাহমানের বাড়ি ও বাড়ির আঙ্গিনায় থাকা পুকুর যেখানে তার ছেলে পানিতে ডুবে মারা গিয়েছিলেন- সেই পুকুর পরিদর্শন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তার পুরোনো সেই দোতলা বাড়ি এখন অনেকটাই জরাজীর্ণ। সেখানে কেউ এখন আর বসবাস করেন না। বাড়ির গেট সাধারণত তালাবদ্ধ থাকে। কোনো দর্শনার্থী দেখতে আসলে মাঝে মাঝে গেট খুলে দেওয়া হয়। বাড়ির সামনের রাস্তা এখনো সেই আগের দিনের মতোই ভাঙা কাঁচা।
এদিকে কবি শামসুর রাহমানের বাড়িতে ঈদ পুনর্মিলনীকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গল্প, আড্ডার পাশাপাশি নানা খেলাধুলার আয়োজন করে। এসব খেলাধুলায় বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন আলোচনা সভায় অংশ নেওয়া অতিথিরা। খেলায় বিজয়ীরা হলেন- রাসেল মাহমুদ, ইমরান হোসেন ফাগুন, মো: মিরাজ ভূইয়া, আকরাম হোসেন, মো: আল আমিন, জসিম মিয়া, রাশেদা আক্তার, তনয়া শবনম ঋতুসহ আরও কয়েকজন।