তেলের লাইনে থমকে আছে জীবিকার চাকা

: চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশ: 2 months ago

87

চট্টগ্রাম নগরের পেট্রোল পাম্পগুলোতে প্রখর রোদে পুড়ছে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হওয়া গাড়ির সারি। সেই সারি কোথাও এক কিলোমিটার ছাড়িয়ে গেছে। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের চোখে মুখে ক্লান্তি আর অনিশ্চয়তা। কেউ দাঁড়িয়ে আছেন ভোর থেকে, কেউবা মাত্র এসে দীর্ঘ লাইন দেখে কপালে হাত দিচ্ছেন।

গত কয়েক দিন ধরে চলা জ্বালানি সংকটে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের লাখো মানুষের নাভিশ্বাস এখন চরমে। এই সংকট কেবল যানবাহনের নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকার সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাগরিকা হাক্কানি ফিলিং স্টেশনের সামনে মোটরসাইকেলে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন সুবহান মাতাব্বর। এই দুই চাকার ওপরই টিকে আছে তাঁর ছয় সদস্যের সংসার। প্রতিদিন সকাল ৭টায় বের হন আর ঘরে ফেরেন রাত ১১টায়। রাইড শেয়ার করে যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে সন্তানদের পড়াশোনা আর বাজার-সদাই।

সুবাহান মাতাব্বর বলেন, ‘গতকাল সারাদিনে মাত্র ২ লিটার অকটেন পেয়েছিলাম। রাইড শেয়ার করে পেয়েছি ৮৫০ টাকা। রাতে ফেরার সময় দেখি পাম্প বন্ধ। আজ সকাল থেকে তেলের আশায় দাঁড়িয়ে আছি। এখন দুপুর ১২টা বাজে। এই সময়ে আর যাত্রী পাওয়া যায় না। এখন তেল পেলেও বিকেলের আগে ভাড়া নিতে পারব না। আজ হয়ত আর আয় করা সম্ভব হবে না।

সরেজমিনে দেখা যায়, কেবল ব্যক্তিগত গাড়ি নয়, তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি পণ্যবাহী ট্রাক ও বিশালাকার কন্টেইনার লরি। কিউসি পেট্রোল পাম্প, হাক্কানি ফিলিং স্টেশন এবং এ আর ফিলিং স্টেশনের সামনে বাঁশের ব্যারিকেড দিয়ে রাখা হয়েছে। ঝুলছে ‘তেল নেই’ লেখা নোটিশ।

পরিবহণসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কন্টেইনারবাহী লরিগুলো পাম্পে আটকে থাকায় চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য খালাস এবং শিল্পকারখানায় কাঁচামাল পৌঁছানোর কাজ স্থবির হয়ে পড়েছে। সময়মতো পণ্য পৌঁছাতে না পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি আদেশ বাতিলের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, এই সরবরাহ সংকট দীর্ঘায়িত হলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

সড়কে গণপরিবহণ কমে যাওয়ায় মোড়ে মোড়ে যাত্রীদের জটলা দেখা গেছে। তেলের অভাবে অনেক বাস না চলায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও রিকশাগুলো সুযোগ বুঝে দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়া আদায় করছে। অফিসগামী যাত্রীরা বলছেন, এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও বাসে উঠতে পারছেন না তারা।

পাম্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ডিপো থেকে তেলের সরবরাহ বন্ধ থাকায় তারা নিরুপায়। তবে তেলের লরি আসার অপেক্ষায় আছেন তারা।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) নথিপত্র অনুযায়ী, ৫ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত দেশে জ্বালানি তেলের মজুত সন্তোষজনক। বিপিসির হিসাবমতে, বর্তমানে দেশে ১ লাখ ২২ হাজার ৬৬০ মেট্রিক টন ডিজেল এবং ৩৪ হাজার ১৩৩ মেট্রিক টন অকটেন মজুত রয়েছে, যা দিয়ে আগামী অন্তত ২০ থেকে ২৫ দিনের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানো সম্ভব।

আমদানির চিত্রে দেখা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় মালয়েশিয়া থেকে আসা‘শান গ্যাং ফা জিয়ান’ (Shan Gang Fa Jian) জাহাজটি ৩৪ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছেছে। এ ছাড়া, সিঙ্গাপুর থেকে আসা ‘ইউয়ান জিং হে’ (Yuan Jing He) জাহাজটি বর্তমানে পতেঙ্গার ডলফিন জেটিতে ২৭ হাজার ৩০০ মেট্রিক টন ডিজেল খালাস করছে।

বিপিসি বলছে, চলতি অর্থবছরে মোট ৬৫ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন পরিশোধিত তেল আমদানির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে এবং পাইপলাইনে আরও বেশ কিছু জাহাজ আসার পথে। তবে বন্দরে তেল পৌঁছালেও ডলার পেমেন্ট জটিলতা এবং জাহাজ থেকে পতেঙ্গা ডিপোতে তেল খালাসের ধীরগতির কারণে পাম্পগুলোতে সময়মতো সরবরাহ পৌঁছাচ্ছে না। এই ‘সাপ্লাই চেইন’ বা সরবরাহ ব্যবস্থার সংকটের কারণেই মজুত থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষকে তেলের পাম্পে দীর্ঘ লাইনে প্রহর গুনতে হচ্ছে।

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com