
কুষ্টিয়ায় অস্ত্রোপচারের সময় অ্যানেসথেসিয়া প্রয়োগের কয়েক মিনিটের মধ্যেই ছয় বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় উত্তেজিত স্বজন ও স্থানীয় লোকজন হাসপাতাল ভাঙচুর চালিয়েছে। পরে পুলিশ ও সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ঘটনার পর দুই চিকিৎসককে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে কুষ্টিয়া শহরের মোল্লাতেঘরিয়া এলাকায় অবস্থিত একতা প্রাইভেট হাসপাতালে এ ঘটনা ঘটে। মৃত শিশুটির নাম তাসনিয়া আফরিন (৬)। সে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার সানপুকুরিয়া গ্রামের তরিকুল ইসলামের মেয়ে।
শিশুটির পরিবার জানায়, চার-পাঁচ দিন আগে বাড়ির সিঁড়ি থেকে পড়ে তাসনিয়ার বাঁ হাত ভেঙে যায়। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নেওয়া হলেও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় সোমবার বিকেলে শিশুটিকে কুষ্টিয়া শহরের একতা প্রাইভেট হাসপাতালে নেওয়া হয়। এ সময় শিশুটির বাবা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
চিকিৎসকরা শিশুটির হাতের অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিলে পরিবারের সম্মতির ভিত্তিতে অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সন্ধ্যা সাতটার দিকে তাসনিয়াকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়। সেখানে অস্ত্রোপচারের জন্য কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক আবদুল হাদী এবং অ্যানেসথেসিয়া প্রয়োগের জন্য তাহেরুল আল আমীন উপস্থিত ছিলেন।
স্বজনদের অভিযোগ, অ্যানেসথেসিয়া প্রয়োগের কয়েক মিনিটের মধ্যেই শিশুটির মৃত্যু হয়। খবরটি অপারেশন থিয়েটারের বাইরে থাকা স্বজনদের কাছে পৌঁছলে তারা কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরে ক্ষুব্ধ স্বজন ও স্থানীয় লোকজন হাসপাতাল ভাঙচুর চালায়।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। রাত ১১টা পর্যন্ত পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা সেখানে অবস্থান করেন। এ ঘটনায় দুই চিকিৎসককে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
শিশুটির স্বজনদের দাবি, চিকিৎসকদের অবহেলা এবং ভুলভাবে অ্যানেসথেসিয়া প্রয়োগের কারণেই তাসনিয়ার মৃত্যু হয়েছে। শিশুটির খালু আতিয়ার রহমান বলেন, চিকিৎসকদের অবহেলা ও সঠিক চিকিৎসা না দেওয়ার কারণে একটি শিশুকে মেরে ফেলা হয়েছে। এর কঠিন বিচার হতে হবে।
এ বিষয়ে অ্যানেসথেসিস্ট তাহেরুল আল আমীন সাংবাদিকদের বলেন, শিশুটির সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা স্বাভাবিক ছিল। জেনারেল অ্যানেসথেসিয়া দেওয়ার পর সে মৃত্যুবরণ করে। হয়তো হার্ট অ্যাটাকের কারণে মেয়েটির মৃত্যু হয়েছে।
কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা হোসেন ইমাম বলেন, অপারেশনের আগে মেয়াদোত্তীর্ণ বা নিম্নমানের অ্যানেসথেসিয়া কিংবা সঠিকভাবে প্রয়োগ না করার কারণেও এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। তবে প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
একতা প্রাইভেট হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইদুল ইসলাম জানান, শিশুটিকে অজ্ঞান করার পরপরই তার মৃত্যু হয়। তিনি বলেন, অ্যানেসথেসিস্ট বেশ কয়েক বছর ধরে এখানে কাজ করছেন। অ্যানেসথেসিয়া কীভাবে বা কতটুকু প্রয়োগ হয়েছে সেটা চিকিৎসকই ভালো বলতে পারবেন। রাতে পুলিশ তাদের হেফাজতে নিয়ে গেছে। বিক্ষুব্ধ জনতা হাসপাতাল ভাঙচুর করেছে।
কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন এস এম কামাল হোসেন বলেন, বিষয়টি জেনেছি, হাসপাতালটির বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসায় কোনো গাফিলতি ছিল কি না তা তদন্ত করে দেখা হবে।
কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কবির হোসেন মাতুব্বর বলেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করা হয়েছে এবং দুই চিকিৎসককে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।