
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে যেমন নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তেমনি এর অর্থায়ন ও ব্যয় নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্নও। প্রায় এক লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই মেগা প্রকল্পের ৯০ শতাংশ অর্থ ঋণ হিসেবে দিচ্ছে রাশিয়া, যা বাংলাদেশকে ২৮ বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে আর্থিক, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সব ধরনের সহায়তাই দিচ্ছে রাশিয়া। শুরুতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ছয় টাকা ধরা হলেও অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, বর্তমানে তা প্রায় ১২ টাকায় পৌঁছাতে পারে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। ব্যবহৃত তৃতীয় প্রজন্মের রিঅ্যাক্টর প্রযুক্তিতে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তাব্যবস্থা। ব্যবহৃত জ্বালানি আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে রাশিয়ায় ফেরত পাঠানো হবে। প্রায় ৬০ বছর আয়ুষ্কালের এই বিদ্যুৎকেন্দ্র যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে আরও ৩০ বছর পর্যন্ত চালু রাখা সম্ভব।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রূপপুর প্রকল্প শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি দেশের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে কার্বন নিঃসরণ খুবই কম, যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সহায়ক। পাশাপাশি কম জ্বালানিতে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের কারণে কয়লা ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাবে এই কেন্দ্র। বিশ্বজুড়ে বিতর্ক থাকলেও আধুনিক সময়ে পারমাণবিক শক্তিকে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
জানা গেছে, পারমাণবিক জ্বালানি মূলত ইউরেনিয়াম থেকে তৈরি হয়। ইউরেনিয়াম অক্সাইড দিয়ে ছোট ট্যাবলেটের মতো জ্বালানি দানা বা পেলেট তৈরি করা হয়, যার ব্যাস সাধারণত ৮ থেকে ১৫ মিলিমিটার এবং দৈর্ঘ্য ১০ থেকে ১৫ মিলিমিটার। এসব পেলেট চার মিটার দীর্ঘ ধাতব নলের মধ্যে সাজিয়ে তৈরি করা হয় জ্বালানি রড। পরে নির্দিষ্ট কাঠামোয় একাধিক রড একত্র করে তৈরি হয় ফুয়েল অ্যাসেম্বলি বা জ্বালানি বান্ডেল।
২০২৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর আকাশপথে রাশিয়া থেকে ঢাকায় আসে পারমাণবিক জ্বালানির প্রথম চালান। পরবর্তীতে আরও কয়েকটি চালান আসে এবং বিশেষ নিরাপত্তায় সড়কপথে অক্টোবরে রূপপুরে নেওয়া হয়। মোট ১৬৪টি জ্বালানি বান্ডেল দেশে আনা হয়েছে, যার প্রতিটিতে রয়েছে ৩১২টি করে জ্বালানি রড।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এসব জ্বালানি বান্ডেল চুল্লির কেন্দ্রে স্থাপন করা হচ্ছে। প্রথম ইউনিটে একসঙ্গে ১৬৩টি বান্ডেল ব্যবহার করা হবে। একবার জ্বালানি স্থাপন করলে প্রায় ১৮ মাস বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। ব্যবহৃত জ্বালানি তেজস্ক্রিয় হওয়ায় তা বিশেষ ব্যবস্থায় রাশিয়ায় ফেরত পাঠানো হবে এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার নজরদারিতে প্রতিটি বান্ডেলের হিসাব রাখা হবে।
রি-অ্যাক্টরের নকশা অনুযায়ী, ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি কোরে বসাতে সময় লাগবে প্রায় ৩০ দিন। এরপর শুরু হবে ফিজিক্যাল স্টার্টআপ, যেখানে নিউক্লিয়ার ফিশন রিঅ্যাকশন চালু করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে প্রায় ৩৪ দিন সময় লাগবে।
পরবর্তী ধাপে ধীরে ধীরে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা বাড়ানো হবে— ৩ শতাংশ, ৫ শতাংশ, ১০ শতাংশ, ২০ শতাংশ এবং ৩০ শতাংশে উন্নীত করতে সময় লাগবে প্রায় ৪০ দিন। রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা ৩ শতাংশে পৌঁছালেই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে। ধাপে ধাপে পূর্ণ সক্ষমতায় যেতে এবং সব পরীক্ষা শেষ করতে মোট সময় লাগবে প্রায় ১০ মাস।
নির্মাণ চুক্তি অনুযায়ী, প্রথম তিন বছর রাশিয়াই জ্বালানি সরবরাহ করবে। এ সময়ে জ্বালানি আমদানি নিয়ে কোনো উদ্বেগ নেই। এরপর বাংলাদেশকে নিজ উদ্যোগে ইউরেনিয়াম আমদানি করতে হবে, তবে দুই বছর পরপর জ্বালানি পরিবর্তন করলেই কেন্দ্রটি সচল রাখা সম্ভব হবে।