প্রায় চার কোটি মানুষের থাইরয়েড, অধিকাংশ চিকিৎসার বাইরে

: চলনবিলের সময় ডেস্ক
প্রকাশ: 3 hours ago

36

দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ ভাগ মানুষ কোনো না কোনো থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যায় ভুগছে। তাদের মধ্যে প্রতি ৫ জনের তিনজনই নারী। এখানেই শেষ নয়, প্রতি দুই হাজার তিনশো শিশুর মধ্যে একজন জন্মগত থাইরয়েড সমস্যা ভুগছে। দেশে থাইরয়েডর নিরব বিস্তার ঘটলেও রোগটি নিয়ে তেমন সচেতনতা গড়ে উঠেনি। দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ থাইরয়েড রোগী চিকিৎসার বাইরে রয়েছে বলে জানিয়েছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।

বৃহস্পতিবার (৭ মে) দুপুরে রাজধানীর দ্য থাইরয়েড সেন্টারের সভাকক্ষে থাইরয়েড মেলার উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেসের (নিনমাস) পরিচালক অধ্যাপক ডা. এ কে এম ফজলুল বারী বলেন, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ কোন না কোন থাইরয়েড রোগে ভুগছেন। থাইরয়েড আক্রান্তদের মধ্যে প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জনেই নারী। প্রতি ২ হাজার ৩০০ শিশুর মধ্যে একজন জন্মগত থাইরয়েড সমস্যায় ভুগছে। এ সকল আক্রান্ত ব্যক্তির ৬০ শতাংশই চিকিৎসা সেবার আওতায় নেই। এক গবেষণায় দেখা গেছে থাইরয়েড রোগ বিস্তারে বংশগতির প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে দাদি, নানি বা মা এদের থাইরয়েডে সমস্যা থাকলে ৭০ শতাংশর ক্ষেত্রে শিশুদের ও আত্মীয়স্বজনদের থাইরয়েড সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আট শতাংশ রোগী সাব-ক্লিনিক্যাল হাইপোথাইরোডিসম-এ ভুগছে, যার অধিকাংশই তাদের থাইরয়েড আছে তা জানে না।

তিনি বলেন, জনসচেতনতা তৈরি করার লক্ষ্যে দি থাইরয়েড সেন্টার লিমিটেড ও বিটমির প্রায় দুই যুগ ধরে কাজ করছে। ২০১৭ সাল থেকে প্রতিবছর নিয়মিতভাবে থাইরয়েড মেলার আয়োজন করে আসছে। তিন দিনের মেলায় প্রায় তিন হাজার থাইরয়েড রোগী বিনামূল্যে ও কম মূল্যে সেবার ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়াও দি থাইরয়েড সেন্টারে প্রায় ১০ হাজার নিয়মিত সদস্য রয়েছে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেসের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. ফরিদুল আলম বলেন, থাইরয়েড সমস্যার কারণে দেশের আগামী প্রজন্মের বুদ্ধিমত্তা ও কর্মক্ষমতার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। অনেকের কাজ করতে ভালো লাগে না। শরীর দুর্বল লাগে কিংবা শুয়ে থাকতে ভালো লাগে। এসব কিন্তু থাইরয়েডের লক্ষণ। থাইরয়েডের কারণে মায়েরা সন্তান ধারণের সক্ষমতা হারাচ্ছেন। একটা সুস্থ ও সবল জাতি গঠনের জন্য থাইরয়েড প্রতিরোধে আমাদের সবাইকে নিয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। লক্ষণ দেখা দিলে বিলম্ব না করে দ্রুত চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হতে হবে। এছাড়াও তিনি ক্রমবর্ধমান থাইরয়েড রোগী ও থাইরয়েড ক্যান্সার রোগীর চিকিৎসার জন্য দেশে অপ্রতুল ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির মহাসচিব ডা. শাহজাদা সেলিম বলেন, থাইরয়েড একটি নীরব ঘাতক। অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা লক্ষণগুলোকে সাধারণ সমস্যা ভেবে অবহেলা করেন, ফলে রোগটি দীর্ঘদিন অজানা থেকে যায় এবং পরে গুরুতর আকার ধারণ করে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সচেতনতা এবং প্রাথমিক অবস্থায় নির্ণয়ই থাইরয়েডজনিত ঝুঁকি থেকে সুরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

তিনি বলেন, থাইরয়েডের কারণে এত ক্ষয়ক্ষতি হলেও রোগটি নিয়ে তেমন আলোচনা নেই। অনেকটা নিরবেই ঘাতকের মতো ক্ষতি করে যাচ্ছে। দেশের প্রায় ৪ কোটি মানুষ কোনো না কোনো ভাবে রোগটিতে আক্রান্ত। এ রোগ মোকাবেলায় আমাদের সবার মধ্যে সচেতনতার বিকল্প নেই।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, থাইরয়েড রোগ ছোঁয়াচে নয়। থাইরয়েড সমস্যা নিয়মিত চিকিৎসায় রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তবে চিকিৎসা না নিলে মৃত্যুর কারণ হতে পারে। যদি হঠাৎ ওজন বেড়ে যায় বা কমে যায়, অতিরিক্ত ঘাম হয়, শীত বা গরম অসহ্য লাগে, শরীর ব্যথা করে, চুল পড়ে যায়, ত্বকের সমস্যা থাকে তাহলে ধরে নিতে হবে থাইরয়েডের ঝুঁকিতে আছেন। এছাড়াও যদি বুক ধড়ফড় বা হাত-পা কাঁপে, গলার স্বর বসে যায়, পাতলা পায়খানা হয়, শারীরিক দুর্বলতা থাকে, নিঃসন্তান দম্পতি বা বারবার গর্ভপাত হয়, অনিয়মিত-কম-বেশি মাসিক হয়, তাহলে অবশ্যই থাইরয়েড পরীক্ষা করতে হবে।

মেলার উদ্বোধন শেষে সংবাদ সম্মেলনে চিকিৎসাকরা জানান, গতকাল বুধবার (৬ মে) শুরু হওয়া এই মেলা চলবে আগামী শনিবার (৯ মে) পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত এই মেলা সবার জন্য উন্মুক্ত। জীবনে চারটি সময়ে অবশ্যই থাইরয়েড স্ক্রিনিং করা প্রয়োজন। প্রথমত জন্মের পরপরই, দ্বিতীয়ত বয়ঃসন্ধিকালে, এ ছাড়াও মায়েদের গর্ভধারণের পূর্বে ও বয়স ৪০ হওয়ার পরপর থাইরয়েড স্ক্রিনিং প্রয়োজন।

সংবাদ সম্মেলনে রোগী ও রোগীর স্বজনদের থাইরয়েড রোগ সর্ম্পকে সচেতন করেন। মেলায় ৫০০ টাকা ভিজিটে থাইরয়েড বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রোগী দেখবেন। ৩ হাজার ৫০০ টাকায় থাইরয়েড চেকআপ (রক্ত, আল্ট্রাসনোগ্রাম এবং ব্লাডগ্রুপিং)। এক বছরের কম বয়সী শিশুদের বিনামূল্যে থাইরয়েড চেকআপ। কম মূল্যে থাইরয়েড ক্যান্সার চিকিৎসা, ২৫ শতাংশ কম মূল্যে এলাস্ট্রস্কান করা হবে। এছাড়াও ২৫ শতাংশ কম মূল্যে থাইরয়েডগ্রন্থি গয়টার/টিউমার/ক্যান্সারের রেডিওফ্রিকুয়েন্সি, লেজার ও স্ক্লেরোথেরাপি করা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য রাখেন নিনমাসের অধ্যাপক ডা. মো. আবু বক্কর ছিদ্দিক, দি থাইরয়েড সেন্টার ও বিটমির চেয়ারম্যান ডা. তানিয়া রহমান, বিটমির-এর সিনিয়র শিক্ষক ডা. মোহিত-উল-আলম, ডা. সোনিয়া ফেরদৌস ও ডা রোমেলা ইয়াসমীন তৃণা প্রমুখ।