
প্রত্যেক স্থানীয় সরকার নির্বাচনে খুনোখুনির ঘটনা ঘটে উল্লেখ করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন বলেছেন, এসব বন্ধে সবার সহযোগিতা নিয়ে কাজ করবে নির্বাচন কমিশন। রক্তপাত বন্ধ করাই তাদের মূল লক্ষ্য। স্থানীয় সরকার নির্বাচন চ্যালেঞ্জিং হবে। তা মোকাবিলার জন্য ইসি সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাজধানীর একটি হোটেলে এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনস আয়োজিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট পর্যবেক্ষণের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
সিইসি বলেন, বর্তমান সরকারকে জনগণ ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে। তাই তারা অবশ্যই দেশের মঙ্গল চাইবে। সরকার অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ স্থানীয় সরকার নির্বাচন চাইবে। এতে তাদের গ্রহণযোগ্যতাও বাড়বে।
তিনি বলেন, ঐতিহাসিকভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংঘাতের ঘটনা বেশি ঘটে। অনেক জায়গায় শুধু প্রাণহানি নয়, বিপুলসংখ্যক মানুষ আহতও হন। এ পরিস্থিতি বন্ধ করতে হবে। এটি এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা কোনো রক্তপাত চাই না। রক্তপাতহীন স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করতে চাই। এজন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।
তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, এ বিষয়ে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। সংঘাত প্রতিরোধে নির্বাচন কমিশন সচেতনতামূলক কর্মসূচিও চালু করবে। স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে সবাইকে একত্রিত করার চেষ্টা করা হবে, যাতে শান্তিপূর্ণ ও সুন্দর নির্বাচন আয়োজন সম্ভব হয়।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সিইসি অতীতের সহিংসতার তথ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ২৩৬ জন নিহত হন। এছাড়া আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ১১৬ জন নিহত হন।
এএমএম নাসির উদ্দিন বলেন, আমাদের চেষ্টার কোনো ঘাটতি থাকবে না। সবার সহযোগিতা পেলে দেশের স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে আমরা সফল হতে পারব। গণতন্ত্র শুধু জাতীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; তৃণমূলের গণতন্ত্র আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইউপি সদস্যরা সরাসরি মানুষের সেবার সঙ্গে জড়িত। স্থানীয় সরকারের মাধ্যমেই গণতান্ত্রিক সরকারের সেবা মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
দলীয় সরকারের আমলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন চাপ অনুভব করবে কি না; এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, নির্বাচনের জন্য সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন। তাদের সহযোগিতা ছাড়া নির্বাচন সম্ভব নয়। কারণ, পুলিশ, সেনাবাহিনী, প্রশাসনসহ সব সরকারি সংস্থাকেই আমরা কাজে লাগাই। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছ থেকে যে সহযোগিতা চেয়েছি, তারা তা দিয়েছে। গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ও আমরা সেই সহযোগিতা পাব বলে আশা করি।
তিনি আরও বলেন, রাজনীতিবিদেরা দেশের কথা চিন্তা করেন, দেশের মঙ্গল চান। তাই সবাই মিলে আমরা ভালো নির্বাচন উপহার দিতে পারব।
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, এ সরকারের অধীনে এখনো আমরা কোনো নির্বাচন করিনি। তাই আগাম কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশে ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৬১টি জেলা পরিষদ, ১৩টি সিটি করপোরেশন এবং প্রায় ৩৩০টি পৌরসভা রয়েছে। এসব পর্যায়ের নির্বাচন আয়োজন একটি বিশাল দায়িত্ব। এজন্য আরও বেশি সহযোগিতা প্রয়োজন হবে।
ঋণখেলাপিদের জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে সর্বোচ্চ আদালতে দুটি মামলা বিচারাধীন থাকায় তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। তবে তিনি দাবি করেন, আমরা কারও প্রতি দয়া দেখাইনি।
নির্বাচনসংক্রান্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কর্মশালার বিষয়ে সিইসি বলেন, কোথায় কোথায় উন্নতির সুযোগ রয়েছে, তা চিহ্নিত করা হচ্ছে। একটি নির্বাচন কমিশন সাধারণত একটি জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করেই বিদায় নেয়। পরে কমিশন নতুন করে শুরু করে। তাই ভবিষ্যৎ কমিশনের জন্য আমাদের অভিজ্ঞতা রেখে যেতে চাই।
ভোটার সচেতনতা কর্মসূচির বিষয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন ছাড়া সংঘাতহীন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্ভব নয়। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংঘাত হয়েই থাকে। তবে জাতীয় নির্বাচন যেহেতু সংঘাতমুক্ত করা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও তা সম্ভব বলে আমাদের আত্মবিশ্বাস রয়েছে।
সিইসি আরও বলেন, ইসি কারও পক্ষেও নয়, কারও বিপক্ষেও নয়। আমরা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে চাই, যেখানে ভোটাররা নিরাপদে ভোট দিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবেন।
দেশের কল্যাণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি সিইসি না হলেও দেশের মঙ্গল নিয়ে ভাবতাম। যে কোনো পরিস্থিতিতে দেশের ভালো কী, সেটাই চিন্তা করি। আমি চাই নির্বাচিত সরকারের হাতেই ক্ষমতা যাক। জনগণের প্রতিনিধিদের হাতে দায়িত্ব থাকুক। কারণ, অন্তর্বর্তী সরকার দীর্ঘদিন চলা গ্রহণযোগ্য নয়। গণতান্ত্রিক সরকারই দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে।
নিজের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার অভিজ্ঞতা আমার আছে। সবার সহযোগিতা নিয়েই নির্বাচন করেছি এবং সবার সহযোগিতা পেয়েছি। কেউ আমাদের প্রত্যাখ্যান করেনি।