মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে বিশ্বকাপে, পর্তুগালকে রুখে দিয়ে গড়লেন ইতিহাস

: স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: 9 hours ago

6

বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে পর্তুগালের বিপক্ষে ম্যাচে ডিআর কঙ্গোর হয়ে সমতা সূচক গোল করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছেন নিউক্যাসল ইউনাইটেডের ফরোয়ার্ড ইউয়ানে উইসা। ম্যাচের প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্তে তার করা গোলেই ১-১ ব্যবধানে ড্র নিশ্চিত করে কঙ্গো, যা ১৯৭৪ সালের পর বিশ্বকাপে দেশটির প্রথম গোল হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেয়।

পর্তুগালের হয়ে ম্যাচের শুরুতেই গোল করেন জোয়াও নেভেস। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে কর্নার থেকে আসা এক আক্রমণে দুর্দান্ত হেডে বল জালে পাঠিয়ে দলকে সমতায় ফেরান ২৯ বছর বয়সী উইসা। তার এই গোল শুধু একটি ম্যাচের ফলই বদলায়নি, বরং বিশ্বকাপে ডিআর কঙ্গোর দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়েছে।

তবে এই সাফল্যের আড়ালে রয়েছে এক ভয়াবহ ও বেদনাদায়ক জীবনগাথা। ২০২১ সালের জুলাইয়ে ৮.৫ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে লরিয়েন্ট থেকে ব্রেন্টফোর্ডে যোগ দেওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে, লেটিসিয়া পি নামে এক নারী ভক্ত সেজে লরিয়েন্টে উইসার বাড়িতে অটোগ্রাফ নিতে আসেন।

ওই সময় এক নারী ভক্ত সেজে তার বাড়িতে প্রবেশ করে তার মুখে অ্যাসিড নিক্ষেপ করে। হামলার সময় তার পরিবারের সদস্যরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীতে জানা যায়, একই ব্যক্তি তার মেয়েকে অপহরণের চেষ্টাও করেছিল।

এই ঘটনায় তার চোখ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং জরুরি অস্ত্রোপচার করতে হয়। চিকিৎসকেরা তাকে দীর্ঘমেয়াদে চোখের ওষুধ ব্যবহার করার পরামর্শ দেন। ঘটনার পর আদালতে দেওয়া সাক্ষ্যে তিনি জানান, সেই সময় ভয় ও আতঙ্কে তার স্বাভাবিক জীবন পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।

‘দ্য সান’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় উইসা বলেছিলেন, ‘আমি দরজা খুলতেই আমার মুখে তরল কিছু ছুড়ে মারা হয়। আমি চিৎকার করে উঠলাম এবং নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম না। আমার স্ত্রী জরুরি পরিষেবায় ফোন করলে তারা আমাকে দ্রুত শাওয়ারের নিচে গিয়ে চোখ ধুয়ে ফেলতে বলে। হাসপাতালে ডাক্তাররা জানান আমার চোখ পুড়ে গেছে। প্রতি ঘণ্টায় কেউ না কেউ এসে আমার চোখ ধুয়ে দিত। এটা ছিল একটা দুঃস্বপ্ন। এরপর থেকে যেকোনো শব্দ শুনলেই আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। শুধু আমার সন্তানরা নিরাপদে আছে—এই চিন্তাটাই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। আমার দুই চোখেই অস্ত্রোপচার করতে হয়েছিল এবং ডাক্তার বলেছেন বাকি জীবন আমাকে আই ড্রপ (চোখের ওষুধ) ব্যবহার করতে হবে।’

পরবর্তীতে ওই হামলাকারী নারীকে ১৮ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এই ঘটনার কারণে ব্রেন্টফোর্ডে তার যোগদানও কয়েক মাস পিছিয়ে যায়। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি ক্লাবটিতে যোগ দেন এবং ধীরে ধীরে আবারও পেশাদার ফুটবলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

লরিয়েন্টে থাকাকালীন উইসার তৎকালীন ম্যানেজার ক্রিস্টোফ পেলিসিয়ের হাসপাতালে তাকে দেখতে গিয়েছিলেন। বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হলেও, ইউয়ানে খুব দ্রুতই সফল হওয়ার দৃঢ় ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। তার অদম্য ইচ্ছা এবং কখনো হাল না ছাড়ার মানসিকতা আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছিল।’

তার সাবেক সতীর্থ পিয়ের-ইভ হামেলও জানিয়েছেন, হামলার পর তিনি কখনও অভিযোগ করেননি। কখনও হতাশায় ভেঙে পড়েননি। বরং সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথই বেছে নিয়েছিলেন। প্লাস্টিক সার্জারির পর সুস্থ হয়ে উঠেছেন তিনি। সেই অদম্য মানসিক শক্তির ফল আজ সবার সামনে। মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে আসা সেই ফুটবলারই এখন ডিআর কঙ্গোর অন্যতম বড় ভরসা। বিশ্বকাপের মঞ্চে দেশের অন্যতম নায়ক।

ব্রেন্টফোর্ডে চার মৌসুমে ১৪৯ ম্যাচে ৪৯ গোল করার পর তিনি যোগ দেন নিউক্যাসল ইউনাইটেডে। নতুন ক্লাবে চোট ও অনিয়মিত সুযোগের মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে গোল করে আবারও নিজের উপস্থিতি জানান দেন এই ফরোয়ার্ড।

তার সাবেক কোচ ও সতীর্থরা জানিয়েছেন, কঠিন সময়েও ইউয়ানে উইসা কখনও হার মানেননি। বরং প্রতিটি বাধাকে তিনি সামনে এগোনোর শক্তি হিসেবে নিয়েছেন।

পর্তুগালের বিপক্ষে এই বিশ্বকাপ ম্যাচে তার শেষ মুহূর্তের গোল শুধু কঙ্গোকে ঐতিহাসিক ড্র-ই এনে দেয়নি, বরং একজন মানুষের অদম্য লড়াইয়ের প্রতীক হিসেবেও জায়গা করে নিয়েছে ফুটবল ইতিহাসে। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে বিশ্বমঞ্চে দেশের নায়ক হয়ে ওঠার গল্প এখন ফুটবল বিশ্বে অনুপ্রেরণার নতুন অধ্যায়।