জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সরকারের কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী

: চলনবিলের সময় ডেস্ক
প্রকাশ: 9 hours ago

12

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশ্বনেতাদের সামনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি তার সরকারের উদ্যোগে আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন-পুনর্খনন, পদ্মা ও তিস্তা অববাহিকার পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণসহ নানা কর্মপরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। এর মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘সমতা, ন্যায্যতা ও ভারসাম্যের মাধ্যমে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের মর্যাদা, সম্মান ও দৃঢ় অবস্থান’ নিশ্চিত করেছেন বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন।

গতকাল মঙ্গলবার সকালে চীনের দালিয়ানে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের এক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী এসব বিষয় তুলে ধরেন। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম আয়োজিত সামার দাভোস ২০২৬ বর্তমানে চীনের দালিয়ানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ‘ইনোভেটিং অব স্কেল’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এই বৈশ্বিক সম্মেলনে বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলের প্রতিনিধিদল, আমন্ত্রিত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা এবং শীর্ষ ব্যবসায়ী, প্রযুক্তি উদ্ভাবক, শিক্ষাবিদ ও করপোরেট নেতারা অংশগ্রহণ করেছেন।

গতকাল বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, গত সোমবার রাতে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর থেকে আমরা চীনের দালিয়ান আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টে এসে পৌঁছেছি। মালয়েশিয়া থেকে চীনের দালিয়ানে প্রধানমন্ত্রী ও তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানের সঙ্গে আমরা ২১ সদস্যের সংক্ষিপ্ত একটি প্রতিনিধিদল এসেছি। যেখানে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা পদমর্যাদার ৮ জন রয়েছেন। এই কলেবরেই প্রধানমন্ত্রী বহুপক্ষীয় বিষয়ে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করে চলেছেন।

মাহদী আমিন বলেন, অত্যন্ত সফল মালয়েশিয়া সফরে প্রধানমন্ত্রী মাত্র কয়েক কর্মঘণ্টা পেলেও তার মধ্যেই মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ও রাজাসহ গুরুত্বপূর্ণ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা করেছেন। সেই ধারাবাহিকতায় চীনে এসে তিনি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক থেকে বর্তমানে বহপক্ষীয় বিষয় নিয়ে উপস্থিত বৈশ্বিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা এরই মধ্যে শুরু করেছেন।

তিনি বলেন, একজন সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাংলাদেশের বাইরে এটিই প্রথম কোনো বৈশ্বিক সম্মেলনে যোগদান। এই সম্মেলনে অংশগ্রহণের মূল লক্ষ্য বাংলাদেশে অধিকতর বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জলবায়ু সহনশীলতা ও টেকসই উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও অংশীদারত্বের সঙ্গে আরও গভীরভাবে সংযুক্ত করা। একই সঙ্গে ‘বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত’ বার্তার মাধ্যমে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি আস্থাশীল ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা হচ্ছে।

মাহদী আমিন বলেন, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রেসিডেন্ট এবং সিইও আলোইস জুইংগি মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। সেখানে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সরকার কীভাবে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে পারবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবে, দেশের মানুষকে অগ্রযাত্রার পথে ধাবিত করতে পারবে, সেগুলো নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে এবং ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির প্রশংসা করা হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘ক্লাইমেট লিডারশিপ ইন এ শিফটিং গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপ’ শীর্ষক সেশনে বক্তব্য দেন। জলবায়ু পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচিত সরকার কর্তৃক গৃহীত কর্মসূচিগুলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে, প্রশংসিত হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তিনি কর্মসূচিগুলো বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন করেন।

তিনি আরও জানান, প্রধানমন্ত্রী সম্মেলনে বিশ্বনেতাদের সামনে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন-পুনর্খনন, পদ্মা ও তিস্তা অববাহিকার পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, সবুজ শিল্পের বিকাশে পাট শিল্প ও পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক ভ্যাহিকেল চালু এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘জলবায়ু কার্যক্রম কোনো ব্যয় নয়; এটি আমাদের সমৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অপরিহার্য বিনিয়োগ।’

মাহদী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতি তহবিলের কার্যকর বাস্তবায়ন, সহজলভ্য ও পর্যাপ্ত জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিতকরণ এবং প্রশমন ও অভিযোজন কার্যক্রমে সমান গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দেন। তিনি জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বৈশ্বিক সংহতি, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও যৌথ দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানান।

নৈশভোজে অংশগ্রহণ: বিকেলের সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের আমন্ত্রণে সস্ত্রীক নৈশভোজে অংশগ্রহণ করছেন। সেখানে বাংলাদেশের পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী কিম মিন-সিওক, মঙ্গোলিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিয়াম-ওসোরিন উচরাল, গিনির প্রধানমন্ত্রী আমাদু ওউরি বাহ, মন্টিনিগ্রোর প্রধানমন্ত্রী মিলোজকো স্পাজিচ, কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রী ওলজাস বেকটেনভের সঙ্গে, অর্থাৎ সাত দেশের সরকারপ্রধানের একসঙ্গে রাষ্ট্রীয় ভোজ এবং উন্মুক্ত আলাপচারিতার দুয়ার উন্মোচিত হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বুধবার সকালে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়ন্স’ অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে অন্যান্য বৈশ্বিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত থাকবেন। সেখানে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক পলিসি নিয়ে আলোচনা করবেন। পরে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের উদ্দেশ্যে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীরা স্থানীয় সময় দুপুর ২টায় দালিয়ান থেকে একটি হাই স্পিড ট্রেনে বেইজিংয়ের উদ্দেশে যাত্রা করবেন।

প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, দালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সামার দাভোসে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ বাংলাদেশের জন্য একদিকে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ করছে, অন্যদিকে বিভিন্ন দেশের বেস্ট প্র্যাকটিস গ্রহণের মাধ্যমে জাতীয় সক্ষমতাকে আরও সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করছে।

সফরসূচি অনুযায়ী, আগামী ২৬ জুন পর্যন্ত অনুষ্ঠিতব্য প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ দিনের চীন সফরে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) সামার দাভোস সম্মেলনে অংশগ্রহণ, চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরামে যোগদান এবং একাধিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম ও বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ: ২৫ জুন বেইজিংয়ে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরামে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। প্রায় ১০০ জন বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়িক প্রতিনিধির উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিতব্য এ আয়োজনে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ তুলে ধরা হবে। এদিন চীনের বিভিন্ন শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পৃথক বৈঠকেরও পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে চেরি গ্রুপ, হান্ডা গ্রুপ এবং চায়নাটেক্স করপোরেশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

চীনের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর ১০ এমওইউ সই হতে পারে: ২৫ জুন বিকেলে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের স্টেট কাউন্সিলের প্রিমিয়ার লি চিয়াংয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকের পর উভয় দেশের মধ্যে প্রায় ১০টি সমঝোতা স্মারক সই ও বিনিময়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর চীনা প্রধানমন্ত্রীর আয়োজিত রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় অংশ নেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে।

প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক ২৬ জুন: আগামী ২৬ জুন সকালে ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে সাক্ষাতের পর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। এ বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন কৌশলগত বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যৌথ বিবৃতি বা সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে মতবিনিময়ের বিষয়টিও চূড়ান্ত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। এদিন তিনি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির জাদুঘর পরিদর্শন করবেন। পরে বিকেলে বেইজিং ড্যাক্সিং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়ে রাতেই দেশে ফেরার কথা রয়েছে।

সফর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির বাইরে সময় ও সুযোগ সাপেক্ষে প্রধানমন্ত্রীর ডালিয়ানের ভেনিস ওয়াটার সিটি, ডংগাং মিউজিক ফাউন্টেন স্কয়ার অথবা বেইজিংয়ের গ্রেট ওয়াল, ফরবিডেন সিটি ও টেম্পল অব হেভেনসহ কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শনের সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে এসব কর্মসূচি এখনো চূড়ান্ত নয়।