সময়মতো ব্যবসার ছাড়পত্র না দিলে অনুমোদন হবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবসা সহজ করার নানা উদ্যোগ

: চলনবিলের সময় ডেস্ক
প্রকাশ: 4 hours ago

5

বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যবসা শুরুর ছাড়পত্র দিতে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা একক প্রবেশদ্বার তৈরি করার কথা বলছে সরকার। সরকারি একটি সংস্থার মাধ্যমে এই প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা করা হবে। প্রতিটি অনুমোদন বা লাইসেন্স সেবার জন্য নির্দিষ্ট সার্ভিস লেভেল অ্যাগ্রিমেন্ট (এসএলএ) নির্ধারণ করা হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সংস্থা মতামত, নাদাবি, অনাপত্তি বা ছাড়পত্র না দিলে ওই সংস্থার সম্মতি আছে বলে ধরে নেওয়া হবে। একই সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে ওই লাইসেন্সের আবেদন নিষ্পত্তি করে ব্যবসা শুরুর ছাড়পত্র দিয়ে দেওয়া হবে। এ ছাড়া ছোট ও নতুন ব্যবসার জন্য অনলাইনে একটি প্রাথমিক অনুমোদনের ব্যবস্থা করা হবে। যাতে উদ্যোক্তা দ্রুত কাজ শুরু করতে পারেন। পরে ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে চূড়ান্ত লাইসেন্স করে নিতে পারবেন।

সরকার ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়াকে সহজ করতে ডিরেগুলেশন বা বিনিয়ন্ত্রণকরণ এবং সংস্কার উদ্যোগের পরিকল্পনা করেছে। সেই বিনিয়ন্ত্রণকরণের অংশ হিসেবে ব্যবসা শুরুর ছাড়পত্রের জন্য এসব প্রস্তাব করা হয়েছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তার বাজেট বক্তব্যে বলছেন, চলমান ভঙ্গুর অর্থনীতিকে টেনে তুলতে এসব পরিকল্পনা প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে শুধু ব্যবসা শুরুর ক্ষেত্রেই নয়, এই বিনিয়ন্ত্রণকরণের পরিকল্পনা করা হয়েছে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক রাজস্ব আয়ের এই তিন খাতের জন্যও।

অর্থমন্ত্রী মনে করছেন, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে আগামী দুই বছরের মধ্যে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। তিনি বলেন, আমরা মনে করি, দুই বছরের মধ্যে অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থা থেকে স্থিতিশীলতার দিকে যাবে। তৃতীয় বছর থেকে দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে এবং চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাবে।

আর ব্যবসায়ীরা বলছেন, এমন পরিকল্পনার কথা সরকারের কাছ থেকে অনেক শুনেছেন তারা; কিন্তু বাস্তবে প্রয়োগ খুব কম। সরকারের রাজস্ব ঘাটতি হলে শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের ক্ষেত্রে সব নীতিই চাপা পড়ে যায়। তাই এসব পরিকল্পনার সঠিক এবং যথাযথ বাস্তবায়ন চান তারা।

গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। আগামী অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাবের মধ্যে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। চলমান অধিবেশনে বাজেট নিয়ে চলছে আলোচনা।

বাজেট বক্তব্যের অষ্টম অধ্যায়টি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ডিরেগুলেশন নিয়েই আলোচনা করেছেন। এতে তিনি ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করতে প্রাথমিকভাবে নয়টি প্রস্তাব পেশ করেন। এগুলোর মধ্যে ব্যবসা শুরুর অনুমোদন পত্র ছাড়াও আরও ছয়টি রয়েছে। এগুলো হলো—বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও দক্ষ জনবলের ওয়ার্ক পারমিট সাত দিনে করা হবে; বড় ও কৌশলগত বিদিশি বিনিয়োগ প্রকল্পে অনুমোদন ও বাস্তবায়ন দ্রুত করতে বিডার পাশাপাশি বেজা, বেপজা ও বিসিকে সহায়তা কর্মকর্তা বা সহায়তা দল বা প্রকল্পভিত্তিক কেইস ম্যানেজার নিয়োগ করা হবে; বিনিয়োগকারীর আইনি সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক আস্থা বাড়াতে দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ ও দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে; স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবসায়িক অনুমোদন সহজ করতে ট্রেড লাইসেন্স সেবা বিনিয়োগ সেবার অন্তর্ভুক্ত করা হবো; নির্বাচিত শিল্পাঞ্চল ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্লাগ অ্যান্ড প্লে শিল্প-সুবিধার প্যাকেজ চালু করা হবে, প্যাকেজের মধ্যে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, সড়ক সংযোগ ও প্রাথমিক অনুমোদন আগে থেকেই সমন্বয় করা থাকবে; বিনিয়োগ সংক্রান্ত আন্তঃদপ্তর অনুমোদন, যাচাই ও মতামত প্রদান সহজ করা হবে এবং অগ্রগতি অনলাইনে দেখার ব্যবস্থা করা হবে।

এক্সক্লুসিভ ক্যানের এমডি ও বাংলাদেশ প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিজিএমইএ) পরিচালক সৈয়দ নাসির বলেন, বাজেটে ব্যবসা সহজ করার বেশ কিছু উদ্যোগের কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী। সেগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হলে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ হবে। তবে, আমলাতন্ত্রের সংস্কার না আনা গেলে ব্যবসা সহজ করার এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর করা যাবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

শুধু ব্যবসা শুরু নয়, শুরুর পর আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক কাঠামোতেও সংস্কার করা হবে। এক্ষেত্রে বিনিয়ন্ত্রণকরণে বেশ কিছু প্রস্তাব উপস্থাপন করেন তিনি।

আয়করের বিনিয়ন্ত্রণকরণের অংশ হিসেবে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ব্যক্তি করের মতো কোম্পানির করপোরেট রিটার্নও অনলাইনে দাখিলের ব্যবস্থা করা হবে, একই সঙ্গে সারা বছর রিটার্ন দেওয়ার নিয়ম চালু করা হবে; উৎসে করের পরিমাণ বছরের নির্ধারিত করের চেয়ে বেশি হলে তা সয়ংক্রিয়ভাবেই রিফান্ড করার পদ্ধতি চালু করা হবে; বিদেশি বিনিয়োগকারীগকে দ্বৈত কর থেকে মুক্তি দিতে ডাবল ট্যাক্সেশন এভয়ডেন্স এগ্রিমেন্টের (ডিটিএ) আওতায় কর সুবিধা পাওয়ার জন্য অনলাইনে সনদ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

ব্যবসা সহজকরণের উদ্দেশ্যে শতভাগ রপ্তানিমুখী কমপ্লায়েন্ট শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রতি বছর বন্ডের অডিটের বাধ্যবাধকতা রহিত করার প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী। এ ছাড়া বন্ডেড ওয়্যারহাউসে এককালীন কাঁচামাল মজুতের সীমা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয় বাজেটে। জুয়েলারি শিল্পের কাঁচামাল আমদানিকে বন্ডেড ওয়্যারহাউসের আওতায় আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়; নতুন ১০টি খাতকে বন্ড লাইসেন্স ব্যতীত শুধু ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়।

ভ্যাটের ক্ষেত্রে বলা হয়, ই-ভ্যাট সিস্টেমের মাধ্যমে অনলাইনে ভ্যাট দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হবে; ক্ষুদ্র ভ্যাটদাতাদের জন্য সহজে ভ্যাট দিতে আলাদা ভ্যাট রিটার্ন ফর্ম প্রবর্তন করা হবে।

ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, বাজেটে বিনিয়োগ ও ব্যবসা সহজকরণে সিঙ্গেল উইন্ডো বাধ্যতামূলক, ওয়ার্ক পারমিট ৭ দিনে, বিদেশি ঋণের সুদে উৎসে কর ২০% হতে ১০%-এ হ্রাস এবং উৎসে কর কর্তনজনিত ব্যয় অগ্রহণযোগ্যতার বিধান বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে। যদি এগুলো সরকার সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে তবে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

অর্থনীতিবিদ ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, বাজেট প্রস্তাবের ডিরেগুলেশন সফল করতে হলে সুশাসন, জবাবদিহি, প্রতিযোগিতা কমিশনের কার্যকারিতা এবং আর্থিক খাতের শক্তিশালী তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা না হলে অর্থনৈতিক ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে। বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠী বেশি সুবিধা পেতে পারে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।

তবে সরকার বাজেটে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিল্প খাতে অপ্রয়োজনীয় সরকারি নিয়ন্ত্রণ, অনুমোদন প্রক্রিয়া ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে বেসরকারি খাতের কার্যক্রম সহজ করা ও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ আরও কার্যকর করার কথা বলেছেন। যেগুলো ইতিবাচক পদক্ষেপ। এর ফলে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেতে পারে, নতুন ব্যবসা তৈরির খরচ ও সময় কমে যাবে, রপ্তানি, শিল্পায়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হতে পারে।