২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের শক্তিশালী, জ্ঞানভিত্তিক ও উদ্ভাবনমুখী অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬’। আগামী ১২-১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার নভোথিয়েটারে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এই ইনোভেশন ফেয়ার।
এই আয়োজনকে কেবল একটি মেলা বা প্রদর্শনী হিসেবে নয়, বরং উদ্ভাবন ও শিল্পায়নের একটি টেকসই জাতীয় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে দেশের বেসরকারি খাত, শিল্পোদ্যোক্তা ও গবেষকদের সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
সোমবার (২৪ আগস্ট) ঢাকায় শেরাটনের গ্র্যান্ড বলরুমে ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬’ আয়োজন উপলক্ষে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা, শীর্ষ শিল্পপতি এবং নীতি-নির্ধারকদের উপস্থিতিতে ডেভেলপিং ইনোভেশন ইকোসিস্টেম টুয়ার্ডস অ্যা ট্রিলিয়ন ডলার ইকোনমি’ শীর্ষক নেটওয়ার্কিং নেটওয়ার্কিং সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এ আহ্বান জানান।
মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরকালীন পর্যায়ে রয়েছে। প্রথাগত পণ্য বা সেবার পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি উচ্চ মূ্ল্য সংযোজনী শিল্প ও উদ্ভাবনী প্রযুক্তি যুক্ত না হলে বৈশ্বিক বাজারে দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হবে।
মন্ত্রী বলেন, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও তরুণ উদ্যোক্তারা প্রতিনিয়ত নতুন উদ্ভাবন নিয়ে কাজ করলেও প্রযুক্তি হস্তান্তর, রেগুলেটরি অনুমোদন, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের সীমাবদ্ধতার কারণে তা সফলভাবে ব্যবসায় রূপ নিতে পারছে না। সরকার এই বিচ্ছিন্নতা দূর করে উদ্ভাবক, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী এবং সরকারি সংস্থার সমন্বয়ে একটি ‘এন্ড-টু-এন্ড ইনোভেশন ইকোসিস্টেম’ তৈরি করছে।
ফকির মাহবুব আনাম বলেন, তরুণ প্রজন্মের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাণিজ্যিকভাবে রূপ দিতে বর্তমান সরকার ৫০০ কোটি টাকার বিশেষ স্টার্টআপ তহবিল গঠন করেছে। কেবল সরকারের পক্ষে উদ্ভাবনভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। সরকার প্রয়োজনীয় পলিসি ফ্রেমওয়ার্ক ও সহায়তামূলক পরিবেশ তৈরি করবে, তবে বাণিজ্যিকীকরণ, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি এডপশনের প্রধান দায়িত্ব বেসরকারি খাতকে নিতে হবে।
বিদেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি দেশীয় শিল্পোদ্যোক্তাদের অগ্রণী ভূমিকা পালনের আহবান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, সিলেট, রাজশাহী, যশোরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নির্মিত হাই-টেক ও ইনোভেশন পার্কগুলোতে আধুনিক অবকাঠামো ও জমি প্রস্তুত রয়েছে। দেশীয় ব্যবসায়ীগণ যেকোনো সময় এসব পার্ক পরিদর্শন করে সেখানে নতুন শিল্প স্থাপন করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন।
মন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটে দেশের শিল্পকারখানাগুলো যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে, সে বিষয়ে সরকার সম্পূর্ণ সচেতন। দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীবর্গ যৌথভাবে সমস্যা সমাধানের জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছেন। আশা করছি অল্প সময়ের মধ্যেই এই সমস্যার সমাধান হবে।
‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬’-এ সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে ব্যবসায়ীদের তাদের নিজস্ব প্রযুক্তি শোকেস করা, উদ্ভাবকদের মেন্টরিং ও ইনকিউবেশনে সহায়তা দেওয়া এবং বাণিজ্যিকিকরণের বাধা বা ফিন্যান্সিং গ্যাপ চিহ্নিত করে সরকারকে সুনির্দিষ্ট মতামত দেওয়ার আহবানও জানান মন্ত্রী।
সভায় সভাপতির বক্তব্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ারের লক্ষ্য হলো উদ্ভাবক, গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়, স্টার্টআপ, শিল্প খাত, বিনিয়োগকারী এবং নীতি-নির্ধারকদের এক ছাদের নিচে এনে একটি সুসংহত জাতীয় প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা। যাতে প্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণ ত্বরান্বিত হয়, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটে, জাতীয় উদ্ভাবন ইকোসিস্টেম শক্তিশালী হয় এবং বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের পথ সুগম হয়।
তিনি আরও বলেন, কর্পোরেট, একাডেমিয়া, গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তিগত পর্যায়ের উদ্ভাবনগুলোকে একটি কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসে ‘ইনোভেট মার্কেট’-এর মাধ্যমে বাণিজ্যিক রূপ দেওয়ার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা নেয়া হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, ন্যানোটেকনোলজি ও বায়োটেকনোলজির মতো উদীয়মান প্রযুক্তিকে আরো কার্যকরভাবে ব্যবহারের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে বায়োটেক পার্ক স্থাপনে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি পাওয়া গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সভায় ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ সরকার, শিক্ষাবিদ ও গবেষক, শিক্ষার্থী, শিল্প খাত, বিনিয়োগকারী এবং উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে শক্তিশালী সহযোগিতার মাধ্যমে একটি সমন্বিত জাতীয় উদ্ভাবন ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার ওপর জোর দেন।
এ নেটওয়ার্কিং সভায় এফবিসিসিআই-এর প্রশাসক ফজলুল হক, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নেতা তপন চৌধুরী, বিজিএমইএ-এর সভাপতি মাহমুদ হাসান খানসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
অংশগ্রহণকারীরা নীতি সংস্কার, গবেষণা বাণিজ্যিকীকরণ, স্টার্টআপ অর্থায়ন, উদ্ভাবন শাসন (গভর্ন্যান্স), মেধার বিকাশ, প্রযুক্তি গ্রহণ এবং বাংলাদেশকে বৈশ্বিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক উদ্ভাবন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ওপর মতামত প্রদান করেন।

চলনবিলের সময় ডেস্ক 























