সংবাদ শিরোনাম ::
বর্তমান স্ত্রীর দাবি ৩০ বছরে তিন বউ ছাড়া কিছুই দেয়নি কাঞ্চন ট্রাম্পের ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে কমলো তেলের দাম দাদার স্মরণে প্রথম ম্যারাথনে অংশগ্রহণ ফিনিশ লাইনের ২ মাইল আগে থেমে গেল র‍্যাচেলের জীবন বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা ও সংঘাত বাড়ছে, সতর্ক করলেন রাজা চার্লস পাহাড়সম ব্যর্থতা ঢাকতে বিরোধীদলের ওপর দায় চাপাচ্ছে সরকার: জামায়াত আমির ওয়াই আকৃতির দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের নির্দেশনা প্রধানমন্ত্রীর শিবগঞ্জে এসআরবির অভিযানে কফ রিলিফ, ফায়ারডিল ও বিদেশি মদ উদ্ধার শাজাহানপুরে করতোয়া নদীর ওপর দুবলাগাড়ী সেতু দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আশার আলো চাঁপাইনবাবগঞ্জে পাচারের উদ্দেশ্যে পরিবহনের সময় ৮০ বস্তা সার জব্দ, ডিলারসহ দুজনের কারাদণ্ড চাঁপাইনবাবগঞ্জে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, ককটেল ও রামদাসহ গ্রেপ্তার ২

সিপিডির পর্যালোচনায় সরকারের ছয় মাস

ইতিবাচক পদক্ষেপ থাকলেও উদ্বেগের পাল্লাই ভারী

চলনবিলের সময় ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ১০:১৯:০৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬ ৬৯ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি




নতুন সরকারের ছয় মাসের পথচলায় কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ দেখা গেলেও সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এখনো গতি পায়নি। মূল্যস্ফীতি কমেছে, রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে রাজস্ব আদায়, শিল্প উৎপাদন, বিনিয়োগ, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ, রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানসহ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলোর বেশির ভাগ জায়গায় এখনো উদ্বেগ রয়েছে বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

নতুন সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রম নিয়ে গতকাল সিপিডি কার্যালয়ে আয়োজিত মিডিয়া সংলাপে এ পর্যালোচনা তুলে ধরা হয়। এতে ৯টি খাতের ৩৬২টি পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ করেছে সংস্থাটি। এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি ‘রিকভারি স্কোরকার্ডে’ মোট ৩১টি সূচকের মধ্যে ১২টিতে উন্নতি এবং ১৯টিতে অবনতি হয়েছে বলে জানানো হয়।

সিপিডির মূল্যায়নে, সরকারের ছয় মাসের সামগ্রিক চিত্র ‘মিশ্র’, তবে উদ্বেগের জায়গাই বেশি। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সূচকগুলো এখনো ভঙ্গুর। ফলে সরকারের নির্ধারিত সময়সীমার চেয়ে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে বেশি সময় লাগতে পারে। সংস্থাটি বলছে, সরকারের সামনে শুরু থেকেই কঠিন বাস্তবতা ছিল। দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা, রাজস্ব আদায়ের সীমাবদ্ধতা, আর্থিক সংকট ও কম বিনিয়োগের মতো কাঠামোগত দুর্বলতা আগে থেকেই ছিল। এর সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি নতুন চাপ তৈরি করেছে। তবে সরকারের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অর্থনীতির একটি সুস্পষ্ট ‘বেসলাইন’ বা ভিত্তিচিত্র তৈরি করা হয়নি।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় অর্থনীতি কাঠামোগত নানা সমস্যার মধ্যে ছিল এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতিও অনুকূলে ছিল না। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার পরিস্থিতি নিয়ে একটি সমন্বিত দলিল তৈরি না করায় এখন বিভিন্ন পদক্ষেপ ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি মূল্যায়ন করা কঠিন হচ্ছে। নতুন সরকারের কাছে দুটি বড় প্রত্যাশা ছিল—অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়িয়ে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা থাকলেও সেখানে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। আরও বলেন, সংস্কার কর্মসূচির ক্ষেত্রেও সমন্বিত কোনো কর্মপরিকল্পনা দেখা যায়নি। ইশতেহারে যেসব কমিশনের কথা বলা হয়েছিল, সেগুলোরও অনেকগুলো বাস্তবায়ন করা হয়নি। সিপিডির পর্যালোচনায় সুশাসনের ক্ষেত্রে ১০৫টি ঘটনার মূল্যায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি এমপিদের প্লট ও গাড়ি না নেওয়ার সিদ্ধান্ত, রামিসা হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনার উদ্যোগ, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (বিপিএসসি) মেধাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ, নারীদের জন্য আলাদা ‘পিংক বাস সার্ভিস’ চালুসহ অনেক পদক্ষেপকে ইতিবাচক বলে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি সরকার ব্যয়সংকোচনের অংশ হিসেবে ধারাবাহিকভাবে বেশ কিছু পদক্ষেপের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তার মাসিক বেতনের ১০ শতাংশ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়াকেও ইতিবাচক বলে মনে করছে সংস্থাটি। এ ছাড়া আইন ও বিচার ব্যবস্থায় ডিজিটালাইজেশনের অগ্রগতি হয়েছে বলে জানানো হয়। অন্যদিকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান (এসওই), আদালতসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের নিয়োগসহ আরও বেশি কিছু বিষয় নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে জানায় সিপিডি।

রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতির আশঙ্কা: সিপিডি জানায়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব প্রবৃদ্ধি জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে ১২ দশমিক ৪ শতাংশ থাকলেও মার্চ-মে সময়ে তা কমে ১১ দশমিক ১ শতাংশে নেমেছে। ফলে বড় রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়েছে। মোট রাজস্বের প্রবৃদ্ধিও ১২ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে নেমে হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। এদিকে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। বার্ষিক লক্ষ্যের তুলনায় ব্যাংক ঋণের অংশ ৪৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৩ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। বৈদেশিক সহায়তার নিট প্রবাহও ৭৭১ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৭৩৪ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। তবে বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে অগ্রগতি হয়েছে; মার্চ-মে সময়ে নিট ঘাটতি অর্থায়ন ৫৭ হাজার ৮৩৬ দশমিক ৭ কোটি টাকা থেকে কমে ১০ হাজার ২৪৪ দশমিক ৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

সিপিডির হিসাবে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তব প্রবণতা বিবেচনায় ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত রাজস্ব ঘাটতির ঝুঁকি রয়েছে।

মূল্যস্ফীতি কমলেও স্বস্তি নেই: ছয় মাসে সবচেয়ে দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তনগুলোর একটি মূল্যস্ফীতি হ্রাস। ফেব্রুয়ারিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে জুলাইয়ে ৮ দশমিক ৩ শতাংশে নেমেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও ৯ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ৭ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। তবে সিপিডির পর্যবেক্ষণ বলছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এখনো মানুষের জন্য উচ্চ অবস্থানে রয়েছে। একই সময়ে মজুরি হার সূচক সামান্য বাড়লেও প্রকৃত মজুরি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচকই রয়েছে। অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতে তারল্য ৭৮ হাজার ১৬১ দশমিক ৬ কোটি টাকা (মে. ২০২৫) থেকে বেড়ে ১ লাখ ৭৭৮ দশমিক ৪ কোটি টাকায় (মে, ২০২৬) দাঁড়িয়েছে।

শিল্প ও বিনিয়োগে হতাশা, ৮ মাসে কর্মসংস্থান হারিয়েছে ৬১,৮৮১ জন: ছয় মাসে বিনিয়োগে এখনো গতি আসেনি। বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ৬৬২ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৫৯৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলাও কমেছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিও ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। শিল্প খাতেও হতাশা। সার্বিক শিল্প উৎপাদন সূচকের প্রবৃদ্ধি কমেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট—এই আট মাসে গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদীর তিনটি প্রধান শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এতে ৬১ হাজার ৮৮১ জন কর্মসংস্থান হারিয়েছেন।

ব্যাংক খাতে সংস্কারের উদ্যোগ, প্রশ্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিয়ে: সিপিডি জানায়, ব্যাংকিং খাতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সমস্যাগ্রস্ত পাঁচটি ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ এবং ব্যাংক রেজল্যুশন আইন ২০২৬ প্রয়োগ করে আর্থিকভাবে অকার্যকর পাঁচটি এনবিএফআইকে রেজল্যুশনের আওতায় আনা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করে আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা জোরদারে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্নও তুলেছে সিপিডি। পাশাপাশি সাবেক গভর্নরের মেয়াদ আকস্মিকভাবে বাতিল ও এবং তার স্থলে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন থাকা ব্যক্তিকে নিয়োগের ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ও উচ্চপর্যায়ের নিয়োগের ভিত্তি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে জানানো হয়।

রপ্তানিতে ঘুরে দাঁড়ানোর আভাস, বাড়ছে আমদানির চাপ: ছয় মাসে বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্বস্তি রয়েছে। রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক ধরা থেকে ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে। আমদানি ও আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলাও বেড়েছে। পাশাপাশি ফেব্রুয়ারিতে ৩০ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে থাকা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও আগস্টে বেড়ে ৩২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। তবে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ২১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১১ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে ওই অঞ্চলের শ্রমবাজারে ধাক্কা লাগায় বিদেশে গড় কর্মসংস্থানও ৯৫ হাজার ৫২১ থেকে কমে ৫১ হাজার ২৩৫ হয়েছে। এদিকে বাণিজ্য ঘাটতি আরও বেড়েছে। ২০২৫ সালের মার্চ-জুন সময়ে যেখানে ঘাটতি ৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ছিল, তা এ বছর একই সময়ে ১০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

জ্বালানি সংকট কাটেনি: জ্বালানি খাতে সরকারের নানা পদক্ষেপ থাকা সত্ত্বেও সংকটও কাটেনি। মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি সমস্যাসহ বেশ কয়েকটি জটিলতায় দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে। এতে বস্ত্র, ইস্পাত, কাগজ, সিরামিকসহ গ্যাসনির্ভর শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শিল্পে গ্যাসের ব্যবহারও ১ হাজার ১৮৬ মিলিয়ন ঘনমিটার থেকে কমে ১ হাজার ১৪৮ মিলিয়ন ঘনমিটারে নেমেছে। তবে লাইফ লাইন গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হয়েছে। অফশোর তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান এবং নতুন গ্যাস অনুসন্ধান কূপ খননের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, যা ইতিবাচক। সংলাপে আরও উপস্থিত ছিলেন, সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান ও অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

সিপিডির পর্যালোচনায় সরকারের ছয় মাস

ইতিবাচক পদক্ষেপ থাকলেও উদ্বেগের পাল্লাই ভারী

আপডেট সময় : ১০:১৯:০৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬

নতুন সরকারের ছয় মাসের পথচলায় কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ দেখা গেলেও সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এখনো গতি পায়নি। মূল্যস্ফীতি কমেছে, রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে রাজস্ব আদায়, শিল্প উৎপাদন, বিনিয়োগ, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ, রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানসহ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলোর বেশির ভাগ জায়গায় এখনো উদ্বেগ রয়েছে বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

নতুন সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রম নিয়ে গতকাল সিপিডি কার্যালয়ে আয়োজিত মিডিয়া সংলাপে এ পর্যালোচনা তুলে ধরা হয়। এতে ৯টি খাতের ৩৬২টি পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ করেছে সংস্থাটি। এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি ‘রিকভারি স্কোরকার্ডে’ মোট ৩১টি সূচকের মধ্যে ১২টিতে উন্নতি এবং ১৯টিতে অবনতি হয়েছে বলে জানানো হয়।

সিপিডির মূল্যায়নে, সরকারের ছয় মাসের সামগ্রিক চিত্র ‘মিশ্র’, তবে উদ্বেগের জায়গাই বেশি। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সূচকগুলো এখনো ভঙ্গুর। ফলে সরকারের নির্ধারিত সময়সীমার চেয়ে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে বেশি সময় লাগতে পারে। সংস্থাটি বলছে, সরকারের সামনে শুরু থেকেই কঠিন বাস্তবতা ছিল। দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা, রাজস্ব আদায়ের সীমাবদ্ধতা, আর্থিক সংকট ও কম বিনিয়োগের মতো কাঠামোগত দুর্বলতা আগে থেকেই ছিল। এর সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি নতুন চাপ তৈরি করেছে। তবে সরকারের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অর্থনীতির একটি সুস্পষ্ট ‘বেসলাইন’ বা ভিত্তিচিত্র তৈরি করা হয়নি।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় অর্থনীতি কাঠামোগত নানা সমস্যার মধ্যে ছিল এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতিও অনুকূলে ছিল না। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার পরিস্থিতি নিয়ে একটি সমন্বিত দলিল তৈরি না করায় এখন বিভিন্ন পদক্ষেপ ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি মূল্যায়ন করা কঠিন হচ্ছে। নতুন সরকারের কাছে দুটি বড় প্রত্যাশা ছিল—অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়িয়ে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা থাকলেও সেখানে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। আরও বলেন, সংস্কার কর্মসূচির ক্ষেত্রেও সমন্বিত কোনো কর্মপরিকল্পনা দেখা যায়নি। ইশতেহারে যেসব কমিশনের কথা বলা হয়েছিল, সেগুলোরও অনেকগুলো বাস্তবায়ন করা হয়নি। সিপিডির পর্যালোচনায় সুশাসনের ক্ষেত্রে ১০৫টি ঘটনার মূল্যায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি এমপিদের প্লট ও গাড়ি না নেওয়ার সিদ্ধান্ত, রামিসা হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনার উদ্যোগ, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (বিপিএসসি) মেধাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ, নারীদের জন্য আলাদা ‘পিংক বাস সার্ভিস’ চালুসহ অনেক পদক্ষেপকে ইতিবাচক বলে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি সরকার ব্যয়সংকোচনের অংশ হিসেবে ধারাবাহিকভাবে বেশ কিছু পদক্ষেপের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তার মাসিক বেতনের ১০ শতাংশ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়াকেও ইতিবাচক বলে মনে করছে সংস্থাটি। এ ছাড়া আইন ও বিচার ব্যবস্থায় ডিজিটালাইজেশনের অগ্রগতি হয়েছে বলে জানানো হয়। অন্যদিকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান (এসওই), আদালতসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের নিয়োগসহ আরও বেশি কিছু বিষয় নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে জানায় সিপিডি।

রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতির আশঙ্কা: সিপিডি জানায়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব প্রবৃদ্ধি জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে ১২ দশমিক ৪ শতাংশ থাকলেও মার্চ-মে সময়ে তা কমে ১১ দশমিক ১ শতাংশে নেমেছে। ফলে বড় রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়েছে। মোট রাজস্বের প্রবৃদ্ধিও ১২ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে নেমে হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। এদিকে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। বার্ষিক লক্ষ্যের তুলনায় ব্যাংক ঋণের অংশ ৪৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৩ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। বৈদেশিক সহায়তার নিট প্রবাহও ৭৭১ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৭৩৪ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। তবে বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে অগ্রগতি হয়েছে; মার্চ-মে সময়ে নিট ঘাটতি অর্থায়ন ৫৭ হাজার ৮৩৬ দশমিক ৭ কোটি টাকা থেকে কমে ১০ হাজার ২৪৪ দশমিক ৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

সিপিডির হিসাবে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তব প্রবণতা বিবেচনায় ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত রাজস্ব ঘাটতির ঝুঁকি রয়েছে।

মূল্যস্ফীতি কমলেও স্বস্তি নেই: ছয় মাসে সবচেয়ে দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তনগুলোর একটি মূল্যস্ফীতি হ্রাস। ফেব্রুয়ারিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে জুলাইয়ে ৮ দশমিক ৩ শতাংশে নেমেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও ৯ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ৭ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। তবে সিপিডির পর্যবেক্ষণ বলছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এখনো মানুষের জন্য উচ্চ অবস্থানে রয়েছে। একই সময়ে মজুরি হার সূচক সামান্য বাড়লেও প্রকৃত মজুরি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচকই রয়েছে। অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতে তারল্য ৭৮ হাজার ১৬১ দশমিক ৬ কোটি টাকা (মে. ২০২৫) থেকে বেড়ে ১ লাখ ৭৭৮ দশমিক ৪ কোটি টাকায় (মে, ২০২৬) দাঁড়িয়েছে।

শিল্প ও বিনিয়োগে হতাশা, ৮ মাসে কর্মসংস্থান হারিয়েছে ৬১,৮৮১ জন: ছয় মাসে বিনিয়োগে এখনো গতি আসেনি। বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ৬৬২ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৫৯৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলাও কমেছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিও ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। শিল্প খাতেও হতাশা। সার্বিক শিল্প উৎপাদন সূচকের প্রবৃদ্ধি কমেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট—এই আট মাসে গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদীর তিনটি প্রধান শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এতে ৬১ হাজার ৮৮১ জন কর্মসংস্থান হারিয়েছেন।

ব্যাংক খাতে সংস্কারের উদ্যোগ, প্রশ্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিয়ে: সিপিডি জানায়, ব্যাংকিং খাতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সমস্যাগ্রস্ত পাঁচটি ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ এবং ব্যাংক রেজল্যুশন আইন ২০২৬ প্রয়োগ করে আর্থিকভাবে অকার্যকর পাঁচটি এনবিএফআইকে রেজল্যুশনের আওতায় আনা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করে আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা জোরদারে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্নও তুলেছে সিপিডি। পাশাপাশি সাবেক গভর্নরের মেয়াদ আকস্মিকভাবে বাতিল ও এবং তার স্থলে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন থাকা ব্যক্তিকে নিয়োগের ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ও উচ্চপর্যায়ের নিয়োগের ভিত্তি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে জানানো হয়।

রপ্তানিতে ঘুরে দাঁড়ানোর আভাস, বাড়ছে আমদানির চাপ: ছয় মাসে বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্বস্তি রয়েছে। রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক ধরা থেকে ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে। আমদানি ও আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলাও বেড়েছে। পাশাপাশি ফেব্রুয়ারিতে ৩০ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে থাকা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও আগস্টে বেড়ে ৩২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। তবে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ২১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১১ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে ওই অঞ্চলের শ্রমবাজারে ধাক্কা লাগায় বিদেশে গড় কর্মসংস্থানও ৯৫ হাজার ৫২১ থেকে কমে ৫১ হাজার ২৩৫ হয়েছে। এদিকে বাণিজ্য ঘাটতি আরও বেড়েছে। ২০২৫ সালের মার্চ-জুন সময়ে যেখানে ঘাটতি ৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ছিল, তা এ বছর একই সময়ে ১০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

জ্বালানি সংকট কাটেনি: জ্বালানি খাতে সরকারের নানা পদক্ষেপ থাকা সত্ত্বেও সংকটও কাটেনি। মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি সমস্যাসহ বেশ কয়েকটি জটিলতায় দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে। এতে বস্ত্র, ইস্পাত, কাগজ, সিরামিকসহ গ্যাসনির্ভর শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শিল্পে গ্যাসের ব্যবহারও ১ হাজার ১৮৬ মিলিয়ন ঘনমিটার থেকে কমে ১ হাজার ১৪৮ মিলিয়ন ঘনমিটারে নেমেছে। তবে লাইফ লাইন গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হয়েছে। অফশোর তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান এবং নতুন গ্যাস অনুসন্ধান কূপ খননের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, যা ইতিবাচক। সংলাপে আরও উপস্থিত ছিলেন, সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান ও অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান।