কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে ৬২৪ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে পুলিশ। বুধবার সন্ধ্যার পর জেলার ১৮টি থানার পুলিশ একযোগে অভিযান শুরু করে, যা চলে রাত দেড়টা পর্যন্ত। আটকদের মধ্যে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীও আছে।
কুমিল্লা জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফুর রহমান জানান, সম্প্রতি বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে উঠতি বয়সের কিশোরদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামানের নির্দেশে জেলার ১৮টি থানায় একযোগে অভিযান চালানো হয়েছে। এসময় ৬২৪ জনকে আটক করা হয়েছে।
অভিযানে জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরাসরি অংশ নেন উল্লেখ করে তিনি জানান, আটকদের তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাই শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
তিনি জানান, কোতোয়ালি থানা ৮২, সদর দক্ষিণ ৪৬, চৌদ্দগ্রাম ৩৮, চান্দিনা ৩০, বুড়িচং ৬২, ব্রাক্ষণপাড়া ২৬, বরুড়া ১৫, লাকসাম ৫২, মনোহরগঞ্জ ৪৩, নাঙ্গলকোট ১৭, দাউদকান্দি ৫৯, তিতাস ২৬, হোমনা ২০, মেঘনা ১০, দেবিদ্বার ২১, মুরাদনগর ১৭, বাঙ্গরাবাজার ১৭ এবং লালমাই থানা ৪২ জনকে আটক করে।
পুলিশ জানায়, বৃহস্পতিবার যাচাই-বাছাই শেষে আটক ৪৫১ জনকে মুচলেকা দিয়ে অভিভাবকদের কাছে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বাকি ১৭৩ জনকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে নিয়মিত মামলার আসামি, ওয়ারেন্টভূক্ত ও মাদকসেবিও রয়েছে।
সম্প্রতি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাহিদা বেগমের কিশোর সন্তান অপ্রতিম হত্যার পর কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যের বিষয়টি ফের আলোচনায় আসে। অপ্রতিম হত্যার পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ওঠে।
যদিও একরাতে অভিযানের নামে বিপুল সংখ্যক কিশোরকে গণআটকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। আটকদের অধিকাংশই ছাত্র এবং তাদের ছেড়ে দিতে হয়েছে।
যদিও পুলিশের ভাষ্য, যেসব এলাকায় ‘বখাটেদের’ উৎপাত এবং কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা রয়েছে, সেসব এলাকায় অভিযান চালানো হয়েছে। আটক কিশোরদের আগে কোনো অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আছে কি-না, তা যাচাই করেই প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ারের ভাষ্য, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার তথ্য নিশ্চিত হয়ে আদালতে পাঠানো হয়। অন্যদের সতর্ক করে পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে।
এদিকে বুধবার রাতে অভিযান শুরুর পর গভীর রাত পর্যন্ত কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানা, সদর দক্ষিণ মডেল থানাসহ বিভিন্ন থানার সামনে অভিভাবকদের ভিড় দেখা যায়। কিশোরদের আটকের খবর পেয়ে থানায় ছুটে আসেন তারা। গভীর রাত পর্যন্ত তাদের অনেকে থানার বাইরে অপেক্ষা করেন।
কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় আটক ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজনকে নগরের ঈদগাহ মাঠ থেকে আটক করা হয়। সেখানে আটকদের একজন নগরের একটি পরিচিত বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার বাবা প্রবাসে থাকেন। মা পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে নগরের নজরুল অ্যাভিনিউ এলাকায় থাকেন। ছেলেকে আটকের খবর পেয়ে তিনি থানায় ছুটে আসেন।
ওই নারী বলেন, ‘আমার ছেলে সন্ধ্যার পর প্রাইভেট পড়তে গিয়েছিল। রাত সাড়ে ৯টার দিকে খবর পাই, তাকে থানায় আটক করা হয়েছে। পরে ছেলের স্কুলের পরিচয়পত্র নিয়ে এসেছি। পুলিশ বলেছে, কোনো অপরাধ না করলে যাচাই করে ছেড়ে দেবে। তারা কয়েকজন নাকি সেখানে আড্ডা দিচ্ছিল।’
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানা এলাকায় আটক কিশোরদের বেশিরভাগকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশ ও কোটবাড়ি এলাকার বিভিন্ন স্থান থেকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরও আছে। তার বাবা কোটবাড়ি এলাকার একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। ছেলেকে আটকের খবর পেয়ে ওই ব্যক্তি মধ্যরাত পর্যন্ত সদর দক্ষিণ থানার সামনে অপেক্ষা করছিলেন।
ওই ব্যক্তি বলেন, ‘কোটবাড়িতে সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে আমার ছেলে তার কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছিল। আমার ছেলে কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত নয়। সে এ বছর এসএসসি পাস করেছে। পুলিশ তাকেও ধরে নিয়ে এসেছে। কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে পুলিশের এ অভিযান ইতিবাচক। তবে অভিযানের নামে শিক্ষার্থীসহ ভালো ছেলেদের সবাইকে এভাবে ধরে নিয়ে এলে সমস্যার সমাধান হবে না।’
সচেতন নাগরিক কমিটি কুমিল্লার সাবেক সভাপতি শাহ মো. আলমগীর খান কালবেলাকে বলেন, পুলিশের ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। এভাবে গণআটক আস্থার সংকট আরও বাড়াবে। সময় নিয়ে মাঠে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়িয়ে অভিযান চালাতে হবে। হুটহাট করলে ফল উল্টো হবে।

কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি 






















