ঢাকা , শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
হারিয়ে যাওয়া লোকজ সাহিত্য ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ

চাটমোহরে কুপিবাতি-হ্যারিকেনের আলোয় পুথিপাঠের আসর

গায়েন মো. লইমুদ্দিন প্রামাণিক পাঠ করেন 'গাজী কালু ও চম্পাবতী'

চলনবিল অধ্যুষিত পাবনার চাটমোহরে হারিয়ে যেতে বসা পুথিপাঠের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উপজেলার বিলচলন ইউনিয়নের প্রত্যন্ত সোনাহারপাড়া গ্রামে কিতাব প্রামাণিকের বাড়ির উঠানে বৃহস্পতিবার রাত ৯টায় বসে পুথিপাঠের ব্যতিক্রমী আসর।

প্রায় ৩০০ বছর আগে মুসলিম সমাজে বিকশিত হওয়া একটি বিশেষ সাহিত্যধারা পুথি সাহিত্য। সময়ের পরিবর্তনে এই সাহিত্যচর্চা অনেকটাই হারিয়ে গেছে। সেই বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতেই চাটমোহরের একদল সাহিত্য ও সংস্কৃতিপ্রেমী তরুণ এ আয়োজন করেন।

চাঁদের আলো, মশাল, কুপিবাতি ও হ্যারিকেনের মৃদু আলোয় তৈরি করা হয় গ্রামীণ আবহ। উঠানে মাদুর বিছিয়ে গোল হয়ে বসেছিলেন নারী-পুরুষ দর্শক। গায়েনের সুরেলা কণ্ঠে পুথির কাহিনি ও পদ্য পাঠে মুহূর্তেই অন্যরকম আবেশ তৈরি হয় পুরো পরিবেশে।

আসরের মধ্যমণি ছিলেন চাটমোহরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ আসাদুজ্জামান দুলাল। তিনি পাঠ করেন ‘বিবি সোনাভান’। আর গ্রামীণ গায়েন মো. লইমুদ্দিন প্রামাণিক পাঠ করেন ‘গাজী কালু ও চম্পাবতী’।

আয়োজনটিতে কোনো আনুষ্ঠানিক অতিথি রাখা হয়নি। বিশেষ কোনো আমন্ত্রণপত্রও দেওয়া হয়নি। হাতে লেখা পোস্টার ও ফেসবুকে প্রচারণার মাধ্যমেই মানুষকে জানানো হয় আয়োজনের কথা। পুথিপাঠের খবর প্রকাশিত হওয়ায়  কয়েকটি জাতীয় ও আঞ্চলিক দৈনিকে আগ্রহ তৈরি হয়। পরে সন্ধ্যার আসরে ভরে যায় পুরো উঠান। দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ। ঢাকা থেকে উপস্থিত হন চলচ্চিত্রের সাউন্ড প্রকৌশলী রিপন নাথ। চাটমোহরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কর্মী ও সাংবাদিকদেরও দেখা যায় আয়োজনে।

পুথিপাঠের এই আয়োজন বাস্তবায়নে সার্বিক সহযোগিতা করেন সজল বিশ্বাস, ডা. আতিক, বিপ্লব আচার্য্য, নিয়ামুল মুক্তা, প্রভাষক আব্দুল মান্নান, অম্লান ভট্টাচার্য, সৌরভকুণ্ডু, শুভ কর্মকারসহ সোনাহারপাড়া গ্রামের অনেকে।

আয়োজকদের পক্ষ থেকে আসাদুজ্জামান দুলাল, মো. লইমুদ্দিন প্রামাণিক ও ওসমাণ গণিকে সম্মাননা দেওয়া হয়। রাত ১১টা পর্যন্ত চলা পুথিপাঠের আসরে উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করেন গ্রামীণ এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজন।

পুথিপাঠের ইতিহাস তুলে ধরে ডা. আতিক বলেন, একসময় এসব আসরে ‘আমীর হামজা’, ‘শাহনামা’, ‘আলেফ লায়লা’, ‘হাতেমতাই’, ‘কমলা সুন্দরীর পুথি’, ‘দেলদার কুমার ও শাহজাদী দিল পিঞ্জির কিচ্ছা’, ‘জঙ্গনামা’, ‘আমীর সওদাগর ও ভেলুয়া সুন্দরীর পুথি’, ‘গাজী কালু ও চম্পাবতী কন্যার পুথি’, ‘তাজকিরাতুল আউলিয়া’, ‘কাসাসুল আম্বিয়া’, ‘বিবি সোনাভান’, ‘ফকির বিলাস’ ও ‘লাইলী মজনু’সহ নানা পুথি পাঠ করা হতো।

তিনি বলেন, হানিফা, হামজা, হাতেমতাই, সোহরাব-রুস্তম ও জৈগুন বিবির মতো বীর চরিত্রকে কেন্দ্র করে রচিত কাব্যগুলো একসময় বিশেষ জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু কালের বিবর্তন, আধুনিকতার প্রভাব এবং আকাশ সংস্কৃতির বিস্তারের কারণে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী পুথিপাঠের আসর আজ বিলুপ্তির পথে।

ডা. আতিক আরও বলেন, উপমহাদেশে পুথি সাহিত্যের সূচনা হয় প্রায় আঠারো শতকে। আনুমানিক ১৬৮০ থেকে ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে হুগলির বালিয়া-হাফেজপুরের কবি ফকির গরীবুল্লাহ ‘আমীর হামজা’ রচনার মাধ্যমে এই পুথি কাব্যধারার সূত্রপাত করেন। ভাষাবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, পুথির প্রায় ৩২ শতাংশ শব্দ ছিল বিদেশি উৎস থেকে আসা। মধ্যযুগে প্রায় ৫০০ বছর ধরে প্রচলিত বাংলা সাহিত্যরীতির তুলনায় পুথির ভাষা ছিল স্বতন্ত্র।

ধারণা করা হয়, পুথি সাহিত্যের ভাষার উৎস ছিল কলকাতা, হাওড়া, হুগলি ও চব্বিশ পরগনা অঞ্চলের মানুষের কথ্যভাষা। সময়ের সঙ্গে পুথি সাহিত্যের জনপ্রিয়তা কমে গেলেও এখনো কিছু মানুষ এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।

ডা. আতিক বলেন, ‘আমরা এই চর্চাকে আবার জাগিয়ে তুলতেই এ আসরের আয়োজন করেছি।’

আসরে উপস্থিত জেমান আসাদ বলেন, ‘আসাদুজ্জামান দুলাল পুথিপাঠ শুরু করার আগেই চারপাশের আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়। মশাল, হ্যারিকেন ও কুপিবাতির আলোয় তিনি সুর করে পুথি পাঠ করছিলেন। মাথার ওপর ছিল ভরা যৌবনের চাঁদ। সব মিলিয়ে আয়োজনটি ছিল চমৎকার।’

তিনি বলেন, ‘আবহ তৈরি করতে আয়োজকেরা যে যথেষ্ট পরিশ্রম করেছেন, তা সহজেই বোঝা গেছে। দূরপথ পাড়ি দিয়ে মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে, নিজেদের হারানো ঐতিহ্য ও স্মৃতির কাছে ফেরার আগ্রহ এখনো মানুষের মধ্যে রয়েছে। এই আগ্রহ তৈরির কৃতিত্ব আয়োজকদের দিতে হবে।’

দর্শকদের অনেকেই মনে করেন, প্রথম আয়োজনেই মানুষের যে স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া পাওয়া গেছে, তা পুথিপাঠের প্রতি নতুন করে আগ্রহ তৈরির ইঙ্গিত। তাই এমন আয়োজনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বিষয়টি আয়োজকদের গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত।

 

চলনবিলের সময়

ট্যাগস :
পাবলিস্ট বাই নিউজ

জনপ্রিয় সংবাদ

হারিয়ে যাওয়া লোকজ সাহিত্য ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ

চাটমোহরে কুপিবাতি-হ্যারিকেনের আলোয় পুথিপাঠের আসর

আপডেট সময় : এক ঘন্টা আগে

চলনবিল অধ্যুষিত পাবনার চাটমোহরে হারিয়ে যেতে বসা পুথিপাঠের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উপজেলার বিলচলন ইউনিয়নের প্রত্যন্ত সোনাহারপাড়া গ্রামে কিতাব প্রামাণিকের বাড়ির উঠানে বৃহস্পতিবার রাত ৯টায় বসে পুথিপাঠের ব্যতিক্রমী আসর।

প্রায় ৩০০ বছর আগে মুসলিম সমাজে বিকশিত হওয়া একটি বিশেষ সাহিত্যধারা পুথি সাহিত্য। সময়ের পরিবর্তনে এই সাহিত্যচর্চা অনেকটাই হারিয়ে গেছে। সেই বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতেই চাটমোহরের একদল সাহিত্য ও সংস্কৃতিপ্রেমী তরুণ এ আয়োজন করেন।

চাঁদের আলো, মশাল, কুপিবাতি ও হ্যারিকেনের মৃদু আলোয় তৈরি করা হয় গ্রামীণ আবহ। উঠানে মাদুর বিছিয়ে গোল হয়ে বসেছিলেন নারী-পুরুষ দর্শক। গায়েনের সুরেলা কণ্ঠে পুথির কাহিনি ও পদ্য পাঠে মুহূর্তেই অন্যরকম আবেশ তৈরি হয় পুরো পরিবেশে।

আসরের মধ্যমণি ছিলেন চাটমোহরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ আসাদুজ্জামান দুলাল। তিনি পাঠ করেন ‘বিবি সোনাভান’। আর গ্রামীণ গায়েন মো. লইমুদ্দিন প্রামাণিক পাঠ করেন ‘গাজী কালু ও চম্পাবতী’।

আয়োজনটিতে কোনো আনুষ্ঠানিক অতিথি রাখা হয়নি। বিশেষ কোনো আমন্ত্রণপত্রও দেওয়া হয়নি। হাতে লেখা পোস্টার ও ফেসবুকে প্রচারণার মাধ্যমেই মানুষকে জানানো হয় আয়োজনের কথা। পুথিপাঠের খবর প্রকাশিত হওয়ায়  কয়েকটি জাতীয় ও আঞ্চলিক দৈনিকে আগ্রহ তৈরি হয়। পরে সন্ধ্যার আসরে ভরে যায় পুরো উঠান। দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ। ঢাকা থেকে উপস্থিত হন চলচ্চিত্রের সাউন্ড প্রকৌশলী রিপন নাথ। চাটমোহরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কর্মী ও সাংবাদিকদেরও দেখা যায় আয়োজনে।

পুথিপাঠের এই আয়োজন বাস্তবায়নে সার্বিক সহযোগিতা করেন সজল বিশ্বাস, ডা. আতিক, বিপ্লব আচার্য্য, নিয়ামুল মুক্তা, প্রভাষক আব্দুল মান্নান, অম্লান ভট্টাচার্য, সৌরভকুণ্ডু, শুভ কর্মকারসহ সোনাহারপাড়া গ্রামের অনেকে।

আয়োজকদের পক্ষ থেকে আসাদুজ্জামান দুলাল, মো. লইমুদ্দিন প্রামাণিক ও ওসমাণ গণিকে সম্মাননা দেওয়া হয়। রাত ১১টা পর্যন্ত চলা পুথিপাঠের আসরে উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করেন গ্রামীণ এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজন।

পুথিপাঠের ইতিহাস তুলে ধরে ডা. আতিক বলেন, একসময় এসব আসরে ‘আমীর হামজা’, ‘শাহনামা’, ‘আলেফ লায়লা’, ‘হাতেমতাই’, ‘কমলা সুন্দরীর পুথি’, ‘দেলদার কুমার ও শাহজাদী দিল পিঞ্জির কিচ্ছা’, ‘জঙ্গনামা’, ‘আমীর সওদাগর ও ভেলুয়া সুন্দরীর পুথি’, ‘গাজী কালু ও চম্পাবতী কন্যার পুথি’, ‘তাজকিরাতুল আউলিয়া’, ‘কাসাসুল আম্বিয়া’, ‘বিবি সোনাভান’, ‘ফকির বিলাস’ ও ‘লাইলী মজনু’সহ নানা পুথি পাঠ করা হতো।

তিনি বলেন, হানিফা, হামজা, হাতেমতাই, সোহরাব-রুস্তম ও জৈগুন বিবির মতো বীর চরিত্রকে কেন্দ্র করে রচিত কাব্যগুলো একসময় বিশেষ জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু কালের বিবর্তন, আধুনিকতার প্রভাব এবং আকাশ সংস্কৃতির বিস্তারের কারণে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী পুথিপাঠের আসর আজ বিলুপ্তির পথে।

ডা. আতিক আরও বলেন, উপমহাদেশে পুথি সাহিত্যের সূচনা হয় প্রায় আঠারো শতকে। আনুমানিক ১৬৮০ থেকে ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে হুগলির বালিয়া-হাফেজপুরের কবি ফকির গরীবুল্লাহ ‘আমীর হামজা’ রচনার মাধ্যমে এই পুথি কাব্যধারার সূত্রপাত করেন। ভাষাবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, পুথির প্রায় ৩২ শতাংশ শব্দ ছিল বিদেশি উৎস থেকে আসা। মধ্যযুগে প্রায় ৫০০ বছর ধরে প্রচলিত বাংলা সাহিত্যরীতির তুলনায় পুথির ভাষা ছিল স্বতন্ত্র।

ধারণা করা হয়, পুথি সাহিত্যের ভাষার উৎস ছিল কলকাতা, হাওড়া, হুগলি ও চব্বিশ পরগনা অঞ্চলের মানুষের কথ্যভাষা। সময়ের সঙ্গে পুথি সাহিত্যের জনপ্রিয়তা কমে গেলেও এখনো কিছু মানুষ এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।

ডা. আতিক বলেন, ‘আমরা এই চর্চাকে আবার জাগিয়ে তুলতেই এ আসরের আয়োজন করেছি।’

আসরে উপস্থিত জেমান আসাদ বলেন, ‘আসাদুজ্জামান দুলাল পুথিপাঠ শুরু করার আগেই চারপাশের আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়। মশাল, হ্যারিকেন ও কুপিবাতির আলোয় তিনি সুর করে পুথি পাঠ করছিলেন। মাথার ওপর ছিল ভরা যৌবনের চাঁদ। সব মিলিয়ে আয়োজনটি ছিল চমৎকার।’

তিনি বলেন, ‘আবহ তৈরি করতে আয়োজকেরা যে যথেষ্ট পরিশ্রম করেছেন, তা সহজেই বোঝা গেছে। দূরপথ পাড়ি দিয়ে মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে, নিজেদের হারানো ঐতিহ্য ও স্মৃতির কাছে ফেরার আগ্রহ এখনো মানুষের মধ্যে রয়েছে। এই আগ্রহ তৈরির কৃতিত্ব আয়োজকদের দিতে হবে।’

দর্শকদের অনেকেই মনে করেন, প্রথম আয়োজনেই মানুষের যে স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া পাওয়া গেছে, তা পুথিপাঠের প্রতি নতুন করে আগ্রহ তৈরির ইঙ্গিত। তাই এমন আয়োজনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বিষয়টি আয়োজকদের গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত।

 

চলনবিলের সময়